একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এক কোটি লোকের। একই সঙ্গে বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত পণ্য রফতানি হবে—এমন প্রত্যাশায় চলছে সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ। যদিও উন্নয়নের গতি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে এক নয়। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের চূড়ান্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আছে ১১টি। কিন্তু চূড়ান্ত লাইসেন্স পেতে প্রি-কোয়ালিফিকেশন বা প্রাক-যোগ্যতাপত্র পাওয়া নয় প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষা শেষই হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন ও পরিচালন কৌশল নির্ধারণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখন পর্যন্ত বেজা ৯৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্ধারণ ও জমির পরিমাণ অনুমোদন সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ৬৪টি। বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ২৯টি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের অর্থনৈতিক অঞ্চল দুটি, জিটুজি অর্থনৈতিক অঞ্চল চারটি ও ট্যুরিজম পার্ক তিনটি।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রস্তাবের ২৯টির মধ্যে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছে ১১টি। এছাড়া ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রাক-যোগ্যতাপত্র বা প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স পেয়েছে নয়টি। মাঝে এক বছর কেটে গেছে। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এ নয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চূড়ান্ত লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়নি। বেজা কর্মকর্তাদের দাবি চূড়ান্ত লাইসেন্সপ্রাপ্তিতে অনেক ধরনের শর্ত পূরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষগুলো সেসব শর্ত পূরণের কাজ শেষ করতে পারেনি বলেই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত লাইসেন্স তারা পায়নি। আর বেসরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর দাবি, মূলত নিয়মনীতি নমনীয় নয় বলেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রাপ্তির অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না তাদের।

এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত লাইসেন্স পায়নি এমন নয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে এ কে খান অর্থনৈতিক অঞ্চল, আরিশা অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইউনাইটেড সিটি আইটি পার্ক, বসুন্ধরা অর্থনৈতিক অঞ্চল, সোনারগাঁ অর্থনৈতিক অঞ্চল, আকিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হামিদ ইকোনমিক জোন ও স্ট্যান্ডার্ড গ্লোবাল ইকোনমিক জোন। এছাড়া লাইসেন্সের অপেক্ষায় আছে এমন  অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের প্রস্তাব আছে আরো নয়টি। যার মধ্যে আছে বিজিএমইএ প্রস্তাবিত গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, ফ্যামক্যাম ইকোনমিক জোন, অ্যালায়েন্স ইকোনমিক জোন, ইস্ট-কোস্ট গ্রুপ ইকোনমিক জোন, সিটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন, আবুল খায়ের ইকোনমিক জোন, ছাতক ইকোনমিক জোন, কাজী ফার্মস ইকোনমিক জোন এবং আনোয়ার ইকোনমিক জোন।

প্রাক-যোগ্যতা লাইসেন্স পেয়েছে এমন নয় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রাপ্তির বিলম্ব নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার অপেক্ষা শেষ না হওয়ার মূল কারণ হলো জমি বিরোধ। বেজার নিয়ম অনুযায়ী একই স্থানে ১০০ একর জমি থাকতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে ৯৫ একর জমি থাকলেও পাঁচ একর যদি খাস বা অন্য উেসর হয়, সেক্ষেত্রে শর্ত পূরণ না হওয়ার শর্তে লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে না।

দেশের আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের অন্যতম বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চূড়ান্ত লাইসেন্স পেলেও আরেকটি প্রাক-যোগ্যতা পেয়েছে এক বছরেরও আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত লাইসেন্স পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জমির সংকট চরম বাস্তবতা। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কোনো জমি নির্ধারণ করতে গেলে একই স্থানে ১০০ একর জমি পাওয়া যাচ্ছে না। আর সরকারের খাসজমি পেলে সেক্ষেত্রে দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে ছয় গুণ বেশি। মূলত এ জমি বিরোধের জন্যই চূড়ান্ত লাইসেন্সপ্রাপ্তি আটকে আছে।

বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আরেকটি কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রাক-যোগ্যতা লাইসেন্স পেতেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এ বিনিয়োগগুলো আটকে গেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরুর আগেই আর্থিক ক্ষতি শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রসরতা ভালো। জমি সরকারের বলে বিনিয়োগকারীদের ব্যয়ও কম হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো, পাশাপাশি নিরুৎসাহিত হচ্ছে বিশেষ করে বিদেশী

বিনিয়োগকারীরা। সব মিলিয়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধই বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কার্যক্রম এক রকম থমকে আছে।

এছাড়া আরো সমস্যা আছে জানিয়ে ওই সূত্র বলছে, সময় বৃদ্ধির সুযোগ রেখে আমাদের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে ১৫ বছরের জন্য। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এলেও লাইসেন্স ১৫ বছরের শুনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সঠিক সময়ে উন্নয়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার হলেও খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে হতাশা হলো বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে বেজার যেসব সহযোগিতা নিশ্চিত করার কথা, তা-ও করা হচ্ছে না যথাযথভাবে। সব মিলিয়ে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, এত বড় উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নানারকম সমস্যা দেখা দিতেই পারে। সেগুলো সমাধান করেই এগিয়ে যেতে হবে। আবার ভালো ফল পেতে সময়ও দিতে হবে। সব সমস্যা সমাধান করেই সরকারের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বজায় রেখে বেজা এ পর্যন্ত ২০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে প্রাক-যোগ্যতা লাইসেন্স প্রদান করেছে। যার মধ্যে ১১টি পেয়েছে চূড়ান্ত লাইসেন্স। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে এবং ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।