স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি ও বেসরকারি—দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ধরনের ডোমেইনের আওতায় আনতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। নতুন এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের ডোমেইন সাফিক্স হবে ‘ডটএসিডটবিডি’। যদিও বর্তমানে দেশের ১৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ সাফিক্সের ডোমেইন রয়েছে মাত্র ৪৪টি। অর্থাত্ ইউজিসির নির্দেশনাটি জারি হলে দেশের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ডোমেইন পরিবর্তন করতে হবে।

ইউজিসির সর্বশেষ মাসিক সভায় এ বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সভার কার্যবিবরণী অনুমোদন পেলে শিগগিরই এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নানা ধরনের ডোমেইনের কারণে বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদাভাবে খুঁজে পাওয়া কঠিন—প্রায় সময়ই র্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের কথা শোনা যায়। এ কারণে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই র্যাংকিংয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃত ওয়েবসাইট না থাকায় সেখানকার সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটিও অনেক জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের বেশকিছু সমস্যার সমাধান আনতেই কমিশন নতুন এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। আশা করছি, সব বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোমেইন আগে থেকে ডটএসিডটবিডিতে রয়েছে। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ডোমেইন সাফিক্স পরিবর্তন করতে হবে। আর ৪৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২২টির ডোমেইন ইউজিসি নির্ধারিত ডোমেইন সাফিক্সে রয়েছে। অর্থাত্ বাকি ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ডোমেইন পরিবর্তন করতে হবে। ইউজিসির নতুন এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে। কারণ বর্তমানে ১০৮টি বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৯টির ডোমেইন ডটএসিডটবিডিতে রয়েছে। অর্থাত্ প্রায় ৯০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ডোমেইন পরিবর্তন করতে হবে। পরিবর্তনের এ তালিকায় রয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের নামও। তবে এর মধ্যে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটই নেই।

একই ধরনের ডোমেইন সাফিক্সের আওতায় আনার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরাও। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রথম কথা হলো, যখনই একটি প্রতিষ্ঠান ডটবিডি ডোমেইনে যাবে, তখন সেটি বাংলাদেশের আওতাভুক্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া ডোমেইন বাবদ কোনো অর্থও বিদেশে যাবে না। শুধু ডোমেইন নয়; হোস্টিংও দেশীয় ব্যবস্থাপনায় করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের (বিডিরেন) মাধ্যমে এ সেবা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

এদিকে কয়েক বছর ধরেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির অভাবে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ওয়েবসাইট খুলে পরিচালিত হচ্ছে সনদ বাণিজ্য। এমনকি অনলাইনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। এমনই একটি ঘটনা ঘটছে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে চারটি ওয়েবসাইট পাওয়া যায় ওয়েবে। এগুলো হলো https://theunicedubd.ac/, https://theuniversityofcumilla.org/, https://unicedu.ac/ ও https://cuedu.org/।

একইভাবে ওয়েবসাইট চালু রয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামেও। জানা যায়, ২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশনার আলোকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত বেসরকারি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এ ঘটনার পাঁচ বছর পার হলেও এখনো দারুল ইহসানের নামে সচল দুটি ওয়েবসাইট অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। সাইটগুলো হলো https://diuedubdpc.com ও http://www.diu-bd.com।

এসব ওয়েবসাইট বন্ধে চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আদালতের নির্দেশে এক বা একাধিক চক্র বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কেন্দ্র করে ওয়েবসাইট চালু করে এখনো সার্টিফিকেট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে মর্মে ইউজিসি এ বিভাগকে জানিয়েছে। এ অবস্থায় বন্ধকৃত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে উল্লিখিত ওয়েবসাইট দুটি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। যদিও চিঠি পাঠানোর ছয় মাসেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চলমান এসব অনিয়ম বন্ধ করতে এখন থেকে নির্দিষ্ট সাফিক্সে ডোমেইন নিতে ইউজিসি থেকে ছাড়পত্র নেয়া আবশ্যিক করা হচ্ছে। অর্থাত্ ইউজিসির ছাড়পত্র ছাড়া ওয়েবসাইট খুলতে পারবে না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিত্ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ওয়েবসাইট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনলাইন সেবা দেয়ার পাশাপাশি সনদ যাচাইকরণের মতো বিভিন্ন সংবেদনশীল কাজও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিছু অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে জাল সনদের ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে সেসব জাল সনদের বৈধতাও দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষা খাতের এসব অনিয়ম বন্ধ খুবই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কমিশন বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেশকিছু বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই সেটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জানিয়ে দেয়া হবে।