নড়াইলে এ বছর পাট উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। পাটচাষীরা বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর এ পাট উৎপাদনকে কেন্দ্র করে নড়াইলের ৩৬ হাজারের বেশি নারীর মৌসুমি আয়ের পথ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছরই নড়াইলের দরিদ্র পরিবারের নারীরা পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে অংশ নিয়ে বাড়তি রোজগার করেন।

নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার আট শতাধিক গ্রামে এবার ৩৬ হাজার ২৫০ জন নারী পাটের আঁশ ছাড়ানো কাজে যুক্ত হয়ে ঘুচিয়েছেন মৌসুমি বেকারত্ব। এতে তাদের সংসারে এসেছে সচ্ছলতা। এটি এখন তাদের মৌসুমি পেশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ৩০০-৫০০ টাকা আয় করছেন তারা। অনেকে এর চেয়েও বেশি আয় করছেন। প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবর—চার মাস এসব নারী পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। এ বছর পাটের আবাদ ভালো হওয়ায় খুশি কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে যুক্ত নারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে পাট উৎপাদনকারী জেলার দিক থেকে নড়াইল অন্যতম। এখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ পাট উৎপাদনে খুবই উপযোগী। লোহাগড়া উপজেলার চাচই গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন জানান, জেলায় অসংখ্য খাল-বিল, জলাশয় ও নদী থাকায় পাট জাগ দিতে সমস্যা হয় না। তবে এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পাট জাগ (পচানো) দিতে কৃষকের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

মরিচপাশা গ্রামের খবির মোল্লা জানান, বর্তমানে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের নারীরা পাটের আঁশ ছাড়ানো কাজের সুযোগ পেয়েছেন বেশি। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গৃহবধূরা এ কাজে অংশ নিচ্ছেন। আরো দুই মাস নারীরা এ কাজ করে বাড়তি রোজগার করবেন।

নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া গ্রামের প্রিন্স জানান, গোবরা ও মূলিয়া সড়কের দুই পাশে উন্মুক্ত জলাশয় থাকায় কৃষক জুলাইয়ে এখানে পাট জাগ দেয়া শুরু করেন। ফলে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে কয়েকশ নারী পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে অংশ নিতে আসেন।

কৃষক সলেমান শেখ বলেন, সাংসারিক কাজ করার পর বাকি সময় এখানে এসে বাড়তি টাকা আয় হয় এসব নারী শ্রমিকের। আরেক কৃষক আলিম মোল্লা জানান, এলাকার নারীরা এ কাজ আনন্দের সঙ্গে করেন।

নারী শ্রমিক আইরিন খানম বলেন, ৩০-৪০টি পাট দিয়ে একটি আঁটি বাঁধা হয়। এক কুড়ি (২০ আটি) পাটের আঁশ ছাড়ালে নারী শ্রমিকরা পান ১০০-১২০ টাকা। এ কাজে অংশ নেয়া তাসলিমা বেগম বলেন, একজন দিনে তিন-চার কুড়ি পাটের আঁশ ছাড়াতে পারেন। এতে তাদের  প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে।

কৃষক তজিবর আলম জানান, জাগ দেয়া পাট খাল থেকে তোলার পর নারীরা আঁশ ছাড়ান। ছাড়ানো আঁশ মালিক পক্ষ নিয়ে যায়। এ কাজে নিয়োজিত নারীরা পাটকাঠি নিয়ে যান। পরে বাজারে অথবা কোনো ব্যাপারীর কাছে বিক্রি করেন পাটকাঠি। তবে বেশির ভাগ নারী শ্রমিক নগদ অর্থ নিয়ে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন।

সদর উপজেলার গোবরা ও মূলিয়া সড়কে শহরের আদিবাসী পাড়ার শিরিনা খাতুন এসেছেন একই কাজ করতে। তিনি বলেন, প্রতি বছর তিনি তিন-চার মাস এ কাজ করেন। এ বছরও মাসখানেক আগে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ শুরু করেছেন তিনি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রতিদিন তিনি এ কাজ করে রোজগার করেন ৩০০-৫০০ টাকা। আরেক নারী শ্রমিক নাসরিন নাহার বলেন, সামনে আরো দুই মাস নিয়মিত এ কাজ করবেন। লতিফা বেগম বলেন, গত এক যুগ ধরে প্রতি বছর তিনি এ কাজ করেন।

নারী শ্রমিক মুন্নি বলেন, পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর তিনি পাঠকাঠি নিয়ে যান। পরে এলাকার ব্যাপারীদের কাছে তা বিক্রি করেন। গত বছরের গোছানো পাঠকাঠি তিনি ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর জুলাই-অক্টোবরের মাঝামাঝি অন্তত এক হাজার নারী নড়াইল-গোবরা ও নড়াইল-মূলিয়া সড়কের দুই পাশে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন। এখানে পাটের আঁশ ছাড়ানো নারী শ্রমিক তন্নি খানম ও মুসলিমা বেগম বলেন, এ কাজ করে তাদের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে।

 নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দীপক কুমার রায় বলেন, এ বছর জেলায় ২৩ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদন হয়েছে। এ কাজে নড়াইলের ৩৬ হাজার ২৫০ জন নারীর মৌসুমি আয়ের পথ সৃষ্টি হয়েছে।  পাট উৎপাদন বেশি হলে গ্রামের এসব খেটে খাওয়া নারীর মৌসুমি আয় আরো বাড়বে।