ভোট পর্যবেক্ষণে প্রতি নির্বাচনেই কেন্দ্রের ভেতরে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটে স্বচ্ছতা আনতেই এ পদক্ষেপ বলে কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন অনেকেই। ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা বসানোর ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও আপত্তি রয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। নিজেদের আপত্তির বিষয়টি জানাতে ইসিতে প্রতিনিধি পাঠানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলটির একাধিক নেতা বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন। তবে ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের বিরোধিতা করবে না দলটি।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ভোট ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সময় কিছু ভোটে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের পাশাপাশি অনলাইনেও ভোটগ্রহণ তদারকি করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আর জোর দেয়া হয়নি। তবে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিয়েই ভোটে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। তাদের অধীনে প্রথম নির্বাচন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ভোটেও ৮৫০টি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। একইভাবে ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ আসনের ভোটেও সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে রাজধানীর নির্বাচন ভবন থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে ইসি। পরে অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়া না হলেও দলের দায়িত্বশীল নেতারা নির্বাচন বন্ধে ঠিকই সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার নিয়েও সমালোচনা করেন তারা। সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও সিসি ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচনে ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে দলের কার্যনির্বাহী সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত অনেকেই বিষয়টিকে ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে প্রসঙ্গটি নিয়ে ইসিতে দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে ফোরামে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল মুহম্মদ ফারুক খান বণিক বার্তাকে বলেন, দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ইভিএমসহ নানা বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই কথা এসেছে যে, পোলিং বুথ অর্থাৎ যেটাকে গোপন ঘর বলা হয় সেখানে যদি সিসিটিভি ব্যবহার করা হয় তাহলে আর গোপনীয়তা থাকে না। আমরা আশা করছি, নির্বাচন কমিশন সার্বিক ব্যাপারটা দেখবে এবং আগামী নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করবে। আমরা চাই, নির্বাচন কমিশন সংবিধান মোতাবেক তাদের দায়িত্ব পালন করুক।
নির্বাচনের বুথে সিসি ক্যামেরা রাখা সংবিধানবিরোধী বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য আব্দুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সম্প্রতি গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন বন্ধ এবং সিসি ক্যামেরা দিয়ে ভোটকেন্দ্রের গোপন কক্ষ দেখানোর বিষয়টি নিয়ে দলের বৈঠকে কেউ কেউ কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, ভোট তো একটা গোপন বিষয়। বুথে সিসি ক্যামেরা রাখাটা এক প্রকার সংবিধানবিরোধী। গোপনীয়তা রক্ষা করে যেখানে ভোট দেয়ার বিষয় রয়েছে সেক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরার সামনে ভোটাররা কোথায় গেল বা কোথায় ভোট দিল—এগুলো একটা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। এসব ব্যাপারেই আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে হয়তো এ ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে বিষয়গুলো অবহিত করা হবে।
এদিকে ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা রাখার কারণে ভোটারের গোপনীয়তা কোনোভাবেই নষ্ট হয়নি বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের। সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, ভোট দেয়ার সময় বুথে ভোটারের সঙ্গে অন্য কেউ প্রবেশ করল কিনা শুধু সেটি ধরা পড়ে ক্যামেরায়, কিন্তু ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছেন, সেটি দেখার কোনো সুযোগ নেই।
নির্বাচনে ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের কোনো অসুবিধা নেই বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে ভোটের যে গোপনীয়তা সেটা যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। আর একটি বিষয় হচ্ছে—সুষ্ঠু ভোটের জন্য সিসি ক্যামেরাই সমাধান, এ ধারণাটা যেন পোষণ না করে নির্বাচন কমিশন। কারণ এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। সিসি ক্যামেরা দিয়ে ভোট ডাকাত ধরা যাবে, কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট হলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা।
ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারে কোনো দোষ দেখছেন না সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা দেখলাম যে, এটা কমিশনকে সাহায্যই করেছে। কারণ কেউ মাঠ থেকে রিপোর্ট করে না। তাছাড়া সিসি ক্যামেরা ব্যবহার কোনো অবৈধ বিষয় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এর ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও শুরু হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যারা বলছেন গোপনীয়তা লঙ্ঘন হচ্ছে, তারা কোনো আইন দেখাচ্ছে না।










