গণপরিসরের বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ন করে রাজধানীর একটি ঐতিহাসিক পার্কে দোকান বরাদ্দ দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। করপোরেশনের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও গণপরিসর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সংস্থাটি কোনোভাবেই এসব জায়গা থেকে বাণিজ্য করতে পারে না। এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবিও উঠেছে।

রাজধানী ঢাকার নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী লক্ষ্মীবাজারের বাহাদুর শাহ পার্ক। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণের পর এ পার্কে এ-সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তখন পার্কটির নামকরণ করা হয় রানী ভিক্টোরিয়ার নামে। পরে ১৯৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর এর নাম হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

ইতিহাসের সাক্ষী এ ছোট্ট পার্কটি পুরান ঢাকার নাগরিকদের বিনোদন ও স্বস্তিতে নিশ্বাস নেয়ার জায়গা। দীর্ঘদিন আশপাশ এলাকার মানুষ এ পার্কে হাঁটাচলা করে, সময় কাটায়, কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে বাহাদুর শাহ পার্কে ‘ফুড ভ্যান’ নামে একটি দোকান ইজারা দেয় ডিএসসিসি। সংস্থাটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিনের সই করা স্মারকে ডিএআর হোল্ডিং লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ফারুক আলমকে ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় দোকানটি ইজারা দেয়া হয়। ইজারা দেয়ার পর ডিএসসিসির মেয়র ফজলে নূর তাপস দোকানটি পরিদর্শন করেন বলে জানা গেছে।

গতকাল বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে দেখা যায়, ঠিক মাঝামাঝি স্থানে একটি দোকানঘর তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ঘরটির মেঝেতে টাইলস বসানো হয়েছে। পার্কের মধ্যখানে দোকান নির্মাণের ফলে এর মূল নকশায় পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়রা জানালেন, মাঝের এ স্থানটিতে তারা ব্যায়াম করতেন, কিন্তু দোকান তোলার কারণে ব্যায়ামের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।

সিটি করপোরেশনের এ সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে পুরান ঢাকার মানুষ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকবর হোসেন বলেন, কোথায় সিটি করপোরেশন পার্ক সংরক্ষণ করবে, তা না করে পার্ক থেকে ব্যবসা করছে। একটা দোকানের অনুমতি দেয়া মানে এখানে আরো পাঁচটা দোকান বসার অনুমতির দুয়ার খুলে দেয়া। পার্ক ও ঐতিহ্য ধ্বংসের এ দায়ভার অবশ্যই মেয়রকে নিতে হবে।

ক্যাফে বাহাদুর নামে ওই দোকানের মালিক মো. রাজিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পার্কের পরিবেশ সুন্দর করার জন্য এখানে দোকান বরাদ্দ নিয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু করেছি। আমাদের সব কাগজ ঠিক আছে।’

পার্কের ভেতর দোকান নির্মাণের কারণে পার্কের বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্নের পাশাপাশি গণপরিসর সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নগর বিশ্লেষকরা। মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইনের বিধান অনুযায়ী খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না বা একই ধরনের জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না।’

তাই সিটি করপোরেশন বাহাদুর শাহ পার্কে দোকান ইজারা দিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন বাজার ছাড়া আর কোথাও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দোকান বরাদ্দ দিতে পারে না। সিটি করপোরেশন সেবা সংস্থা। গণপরিসর-পার্ক-মাঠ এমন সেবার জায়গায়ও যদি সিটি করপোরেশন ব্যবসা করতে চায় তাহলে নাগরিক অধিকার তো নষ্ট হবেই, পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পার্কের বৈশিষ্ট্যও ক্রমে ধ্বংস হয়ে যাবে। সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই এমন বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে হবে।

অন্যদিকে ডিএসসিসির একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, ক্রমান্বয়ে করপোরেশনের আওতাধীন অন্যান্য পার্কেও দোকান বরাদ্দ দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। মেয়র ফজলে নূর তাপসের নির্দেশক্রমেই করপোরেশন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের বাণিজ্যিক ব্যবহার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের পাশাপাশি নগরবাসীর জীবন-মানের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নগরবাসীর জন্য উদ্বেগজনক। বাহাদুর শাহ পার্ক বা অন্য কোনো পার্ক সিটি করপোরেশন কোনো পরিবর্তন করতে চাইলে করপোরেশেনের নগর পরিকল্পনা বিভাগের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। তাদের ওই বিভাগ আদৌ কোনো কাজ করে কিনা আমার সন্দেহ আছে। নয়তো একটা পার্কে আইন ভেঙে দোকান বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি তো অকল্পনীয়।’

করপোরেশন এলাকায় মেয়র যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে বিধি রয়েছে। সিটি করপোরেশন হয়তো এ বিধির যুক্তি দেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নাগরিকের জন্য কল্যাণকর কিনা সেটাও বিশ্লেষণ করতে হবে। পার্ক ও উদ্যানে স্থায়ী স্থাপনা কোনোভাবেই আইনসংগত নয়।  

কীভাবে পার্কের ভেতর দোকান বরাদ্দ দেয়া হলো তা জানতে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি মৌখিক কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।