প্রকৌশলী কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর হাত ধরে ১৯৮৪ সালে যাত্রা করে এনভয় গ্রুপ। ব্যবসার গোড়াপত্তনে মগবাজারে পারিবারিক টিনের বাড়িটি ব্যাংকে বন্ধক রাখতে হয়েছিল কুতুবউদ্দিনকে। সে সময় যৌথ অংশীদারির এ কোম্পানির শুরুটা হয়েছিল পোশাক কারখানা দিয়ে। এরপর সময়ের সঙ্গে বেড়েছে গ্রুপটির ব্যবসা। দুই কাণ্ডারির প্রচেষ্টায় প্রথম প্রজন্মের হাতেই এনভয় গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার ছাড়ায় ৪০ কোটি ডলার।
এনভয়ের ব্যাপ্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এতে যুক্ত হন গ্রুপের প্রধান দুই কর্ণধার কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও আবদুস সালাম মুর্শেদীর সন্তানরা। দ্বিতীয় প্রজন্ম যুক্ত হওয়ার পর ব্যবসার বৈচিত্র্যও বাড়তে শুরু করে। এখন প্রথম প্রজন্ম চাইছে দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে। আর সে কারণেই বহুল আলোচিত পৃথক্করণের পথে হাঁটছে দেশের পুরনো ও প্রথম সারির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত দ্বিতীয় প্রজন্মকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে কাজের সুযোগ করে দিতেই পৃথক্করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
ব্যবসার প্রথম দিন থেকে একসঙ্গে ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও আবদুস সালাম মুর্শেদী। ২৫ লাখ টাকা পুঁজিতে শুরু হওয়া এনভয় গ্রুপের আওতায় এখন রয়েছে ৪০টি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, এনভয়ের আওতাভুক্ত পোশাক কারখানাগুলো ছড়িয়ে আছে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। ফলে প্রায়ই এসব কারখানা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিত। যার প্রভাব পড়ত এনভয় গ্রুপের আওতায় থাকা এবং কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্লাটিনাম স্বীকৃতি পাওয়া এনভয় টেক্সটাইলসের সুনামে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শেয়ার এখন কুতুবউদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের হাতে। সব দিক বিবেচনা করেই এনভয় গ্রুপের পোশাক খাতের ব্যবসার সঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্ত নেয় কুতুবউদ্দিনের পরিবার। এর বদলে বিদেশী অংশীদারদের সঙ্গে পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তারা।
পৃথক্করণের মাধ্যমে এনভয় গ্রুপের মালিকানার পূর্ণ নেতৃত্বে এসেছেন আবদুস সালাম মুর্শেদী ও তার পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে যৌথ অংশীদারির প্রতিষ্ঠানটির নাম এনভয় রেখেছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ। তাই এ নামের সঙ্গে তার আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। এনভয় গ্রুপের পোশাক কারখানার অংশ ছেড়ে দিলেও কুতুবউদ্দিনের এ আবেগকে সম্মান জানাতে চান তার দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যরা। তারা ব্যবসায়ীর উত্তরাধিকারের এ ধারাও বজায় রাখতে চান। আর এজন্যই কুতুবউদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের গঠিত নতুন কোম্পানির নাম দেয়া হয়েছে এনভয় লিগ্যাসি হোল্ডিংস। পোশাক খাতের বিনিয়োগ এনভয় লিগ্যাসির মাধ্যমেই পরিচালনার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আছে প্রয়াত তৌফিক এম সেরাজের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে গড়ে তোলা আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান শেলটেক। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনভয় গ্রুপের কখনো কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ড. তৌফিক এম সেরাজের মৃত্যুর পর শেলটেক গ্রুপ পরিচালনার মূল নেতৃত্বে রয়েছেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
একটি সূত্র জানিয়েছে, এনভয় গ্রুপের দুই অংশীদারের পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মই ব্যবসায় সক্রিয় হতে শুরু করেছে। তাদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা রয়েছে। সেই ভিন্ন চিন্তা ও ভিশনকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে দ্বিতীয় প্রজন্ম যেন মুক্তভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে, সেই ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে একটা পরিবর্তন আসছে। তবে এ নিয়ে কোনো ঝগড়া-বিবাদে নেই দুই পরিবার।
পরিবার সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠান এখন বড় হয়েছে। দুই পরিবারের সন্তানরা বড় হয়েছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ রয়েছে। তারা যে যার মতো ব্যবসা পরিচালনায় আগ্রহী। সামগ্রিকভাবে পৃথক্করণের ধারাবাহিকতায় মূলত এনভয়ের পোশাক খাতের ব্যবসাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকছে না কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের।
পৃথক্করণ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী কুতুবউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায় যোগ্য উত্তরাধিকার গড়ে তোলার চর্চা বাংলাদেশে তেমন একটা দেখা যায় না। আমরা ব্যবসার যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যেতে চাই। সে লক্ষ্যে আমাদের পরের প্রজন্মকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিকাশের সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় দুই পরিবার আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পৃথক্করণে উদ্যোগী হয়েছে। আমরা চাই দ্বিতীয় প্রজন্ম ব্যবসায় তাদের নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করে বিকশিত হবে।
সূত্রমতে, কুতুবউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন শেলটেক গ্রুপে, যার আওতায় এখন মোট ১৭টি কোম্পানি যুক্ত আছে। এসব কোম্পানি আলাদা খাতভিত্তিক; যার মধ্যে আছে রিয়েল এস্টেট, সিরামিক, ভারী নির্মাণ প্রকল্প, ব্রোকারেজ। আছে বেশ কয়েকটি কার্গো জিএসএ, সিকিউরিটি সলিউশনস প্রতিষ্ঠান। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ভোলায় সিরামিক কারখানায় বড় বিনিয়োগ রয়েছে শেলটেকের। বর্তমানে সিরামিকসে টাইলসের পাশাপাশি স্যানিটারিওয়্যারেরও চাহিদা অনেক। সেই বিবেচনায় বর্তমানে সিরামিক কারখানার তিনটি লাইন পুরোপুরি চালু হয়ে যাওয়ার পর স্যানিটারিওয়্যারে বিনিয়োগে যাবে শেলটেক। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো দিনে ২৫-৩০ হাজার কমোড তৈরি হবে।
স্যানিটারিওয়্যারের পর শেলটেকের বিনিয়োগ হবে গ্লাস উৎপাদনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক গ্লাস কারখানার সংখ্যা হাতে গোনা। কিন্তু এ পণ্যের বাজারটি বড়। ফলে এ খাতে ব্যবসার বড় সুযোগ দেখছে শেলটেক। কারণ সিরামিকসের সব পণ্যেই অভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহারের সুযোগ আছে। উৎপাদন প্রক্রিয়াও কমবেশি একই। সে কারণে ভোলায় শেলটেকের বিনিয়োগ প্রকল্পটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আদলে গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পটি শেলটেকের বিজনেস হাব হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
কুতুবউদ্দিন আহমেদের পরিবারের সদস্যদের কাছে এনভয়ের পৃথক্করণের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নতুন কোম্পানি ও শেলটেক নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, শেলটেক মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করে। পাশাপাশি এখন উচ্চবিত্তের আবাসন খাত নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীর বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি এলাকায় উচ্চবিত্তদের জন্য বিশেষায়িত আবাসিক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পোশাক খাত নিয়েও নতুন পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
জানা গেছে, পোশাক খাতে হংকংভিত্তিক ব্যবসায়িক অংশীদার রয়েছে কুতুবউদ্দিন আহমেদের পরিবারের। বাংলাদেশে সেই অংশীদারের পাঁচটি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট আছে, যার তিনটির সঙ্গে কুতুবউদ্দিনের পরিবার জড়িত। এনভয় গ্রুপের গার্মেন্ট ব্যবসা থেকে বেরিয়ে হংকংভিত্তিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে পোশাক খাতের নতুন সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন পরিবারটির সদস্যরা, যার ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে সার্কুলার নিট কম্পোজিট করার চিন্তাভাবনা চলছে। শিগগিরিই চালু হবে ওভেন ইউনিট।
এরই মধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো অ্যাব্রেসিভ পেপার বা শিরিষ কাগজ উৎপাদন ও বাজারজাতের কাজ শুরু করেছেন কুতুবউদ্দিনের ছেলে তানভীর আহমেদ। শতভাগ আমদানিনির্ভর এ পণ্যের বাংলাদেশে বাজারের আকার প্রায় ২৫০-৩০০ কোটি টাকার। শিগগিরই পণ্যটি দেশের বাজারে মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত এনভয় টেক্সটাইলসের ৫১ শতাংশ শেয়ারই রয়েছে শেলটেক ও এর সহযোগী কোম্পানির কাছে। সে হিসেবে বলা যায়, এনভয় টেক্সটাইলসও এখন শেলটেকের অংশ। তানভীর আহমেদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এনভয় টেক্সটাইলস, শেলটেক গ্রুপ মিলিয়ে তাদের পরিবারের ব্যবসা দুই বছরের মধ্যে ৫০ কোটি ডলার হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পোশাক শিল্পে নতুন যত বিনিয়োগ আসবে তার সবই হবে এনভয় লিগ্যাসির মাধ্যমে। আর পোশাকবহির্ভূত শিল্পে যত বিনিয়োগ হবে সব শেলটেকের আওতায় হবে। এনভয় টেক্সটাইলস, এনভয় লিগ্যাসি হোল্ডিংস ও শেলটেক গ্রুপ—এ তিন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকছেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা।
তানভীর আহমেদ জানান, এনভয় লিগ্যাসি হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার বাবা কুতুবউদ্দিন আহমেদ, পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মা রাশিদা আহমেদ ও বোন সুমাইয়া আহমেদ। অন্যদিকে শেলটেক গ্রুপে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন প্রকৌশলী শেখ বশির আহমেদ।
সার্বিক পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তানভীর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, শেলটেকের সক্ষমতায় জমির মালিকরা আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। এ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন খুব জরুরি। প্রত্যেকটি ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করা তখনই সম্ভব যখন মানুষ কোম্পানির ওপর আস্থা রাখে। পাশাপাশি অর্থায়নকারী হিসেবে ব্যাংকের আস্থা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকের মূল চিন্তা থাকে যে তাদের অর্থ পরিশোধ করা হবে কিনা। সেজন্যই তারা উত্তরাধিকার খোঁজে, যার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের বিষয়টিতে নিশ্চিত হতে চায় তারা।
সব মিলিয়ে ব্যবসার প্রথম প্রজন্ম থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মে রূপান্তর খুব জরুরি বলে মনে করেন তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মই পারে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করতে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে। আর এজন্য যে রূপান্তর প্রয়োজন তা যদি দৃশ্যমান থাকে, তাহলে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো জটিলতা থাকে না।
তানভীর আহমেদ আরো বলেন, প্রজন্ম বলতে শুধু নামে পরিবারের সদস্য হবেন, সেটি হবে না। বরং তাদের ব্যবসায় সক্রিয় থাকতে হবে। আমাদের ক্ষেত্রে যেমন প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতাও আছে। আমরা ব্যবসার যে সম্প্রসারণটা করছি, সেগুলো অনেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, যা বাস্তবায়নের জন্য উত্তরাধিকারের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।










