কখনো ভুয়াদাতায়, কখনো আবার জমির মালিককে না জানিয়েই জাল দলিল সৃজন করছে তারা। পরবর্তী সময়ে ওই দলিল জামানত রেখেই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নেয়া হচ্ছে। এসব জমি জামানত নিয়ে বিপাকে পড়ছে ব্যাংক। মামলায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন জমির মূল মালিক। আর মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্র।

নদী, কবরস্থান ও শিকস্তিসহ ৩২৩ বিঘা জমি জামানত রেখে রাজ হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে আড়াইশ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক। একইভাবে জাল দলিল দেখিয়ে ঋণ নেয়া হচ্ছে অন্যান্য ব্যাংক থেকেও। কীভাবে এ জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে, তা খোঁজ নিতে গিয়েই গাজীপুর ও ময়মনসিংহে এ জালিয়াত চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র গাজীপুরের কাপাসিয়া, জয়দেবপুর ও ময়মনসিংহের ভালুকার বিভিন্ন মৌজায় তত্পরতা চালাচ্ছে। তারা স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় কৃষক, প্রবাসী ও মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে দানপত্র সৃজন করছে। জালিয়াতির মাধ্যমে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, এমনকি সরকারি খাসজমিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে চক্রটি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ কাজে সহায়তা করছেন সাব রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকরা। এ ধরনের জালিয়াতির শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী আদালতে একাধিক মামলাও করেছেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ভালুকা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক গোলাম মোস্তফার (লাইসেন্স নং-৬১০৮) নেতৃত্বে ওই উপজেলায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী জালিয়াত চক্র। এ চক্রের সদস্য হিসেবে নাম আছে— পালগাঁও গ্রামের আবদুর রহিম, পানিবান্দা গ্রামের আবুল কালাম, গোলাম মোস্তফা ও বড়চুনার সোহেল, ভরাডোবা গ্রামের ইদ্রিস মাস্টার, আনোয়ার হোসেন মিলন, বালা, ইসমাঈল, আরিফ, পুরুড়া গ্রামের ইকবাল হোসেন, শহিদ, খলিল, দলিল লেখক সিরাজুল ইসলাম সুজনের (লাইসেন্স নং-৬১৪১)।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর গ্রামের মানুষকে উচ্চমূল্যে জমি বিক্রি করে দেয়ার প্রলোভন দেখায় দালালরা। পরে জমির মালিকদের কাছ থেকে মূল দলিল সংগ্রহ করে। এর ভিত্তিতে জাল দলিল তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ওই জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সেই দলিল জামানত দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়। ঋণ দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক কেউই জমির বিষয়টি সেভাবে যাচাই করে দেখে না।

কিছুদিন আগে সেলিম নামে এক দালালের খপ্পরে পড়েন ভালুকা উপজেলার পানিভণ্ডা গ্রামের আজিবার ইসলাম। সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বড় কোম্পানি জমি কিনবে, তাই আগেই তার কাছ থেকে জমির কাগজ চেয়ে নেন মধ্যস্থতাকারী সেলিম। কাগজ পরীক্ষা করে একদিনেই রেজিস্ট্রি করে নেয়ার কথা বলা হয়। মূল কাগজ নিয়ে পরে জাল দলিল তৈরি করে দানপত্রের মাধ্যমে ভুয়া মালিক সাজেন সেলিম। ওই জমি পরে একটি আবাসন কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রি করে দেন এ মধ্যস্থতাকারী। এটিসহ আরো কিছু জমির দলিল জামানত হিসেবে রেখে মোটা অংকের ব্যাংক ঋণ নেয় কোম্পানিটি।

জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, আমার কাছে স্থানীয় লোকজন একটি অভিযোগ দিয়েছে। তবে ভালুকা সাব রেজিস্ট্রার মো. জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, কাগজপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দলিল লেখক ও দলিল চিনাশের। তারা কাগজপত্রের সঠিকতা যাচাই করেই দলিল লেখেন। তাই কাগজপত্রের কোনো ভুল থাকলে তার দায়-দায়িত্বও ওই দুজনের।

ভালুকায় জমি নিয়ে জালিয়াতির বড় একটি ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের লোহাবৈ মৌজার ১০০ পরিবারের প্রায় ৬০ একর জমি ভুয়া দাতার মাধ্যমে দলিল সৃজন করে আর আর এস্টেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। পরে জমির দখল নিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানতে পারে, ওই জমির মূল মালিক ছয় কৃষক। এ ঘটনায় ওই কৃষকরা আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলায় আসামি করা হয়েছে ভালুকা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক গোলাম মোস্তফাসহ ১৪ জনের একটি জালিয়াত চক্রকে।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দলিল লেখক গোলাম মোস্তফা ভুয়া দাতার মাধ্যমে জাল দলিল সৃজন করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি মেদুয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরও জাল করেন। এছাড়া দলিল সৃজনের ক্ষেত্রে দাতাদের জাতীয় পরিচয়পত্রেরও ভুয়া কপি সরবরাহ করা হয়।

এ বিষয়ে মেদুয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জেসমিন নাহার রানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওয়ারিশান সনদের স্বাক্ষরটি তার নয়। তার স্বাক্ষর নকল করে ওই সনদ সৃজন করা হয়েছে। গত এক বছরে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়া-সংক্রান্ত কয়েকশ অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। তার পরও জমি জালিয়াত চক্রের তত্পরতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

গত বছর গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক নয়নবাজার ইউনিয়নের সহরটেক মৌজার ৩৪টি দাগের মোট ৫ দশমিক ৬ একর জমির দলিল করে নামজারি করে রেডিয়েন্ট গ্রুপ। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে দলিল সৃজন করে ওই জমির নামজারির অভিযোগ ওঠে রেডিয়েন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে। পরে জমির মূল মালিকরা আদালতে গেলে আদালত তা আমলে নিয়ে গত বছরের ২২ অক্টোবর ৫৯৫ নম্বর স্মারকমূলে কাপাসিয়া সাব রেজিস্ট্রার বরাবর দলিল দুটির সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য পাঠান। সঠিকতা যাচাইয়ের পর ২৬২ নম্বর স্মারকমূলে সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে আদালতে জানানো হয়, দলিল দুটির কোনো অস্তিত্ব বালাম বইয়ে পাওয়া যায়নি। দলিল দুটি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। এরপর আদালত রেডিয়েন্ট গ্রুপের ওই দলিল দুটি বাতিল করেন।

গাজীপুরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকাটিতে জমির জাল দলিল সৃজন করে তা ব্যাংকে রেখে একাধিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণ নিয়েছে। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের ঋণের অপেক্ষায় আছে।

তবে সরকার এ ধরনের প্রতারণা রুখতে তত্পর বলে জানান গাজীপুরের এডিসি (রেভিনিউ) মাহমুদ হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সরকারি বা অন্যের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান জামানত দিয়ে থাকে ও কোনো ব্যাংক যদি সেই জমি জামানত হিসেবে গ্রহণ করে ঋণ প্রদান করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জমি নিয়ে জালিয়াতি বন্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি।