বেপরোয়া গতিতেই ছুটে চলেছেন খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ঠিকাদার উত্তম কুমার দেব ও স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী অরুণ দাস। একের পর এক অনিয়ম করে চলেছেন দুজন। ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণের সিন্ডিকেট ছাড়িয়ে এখন এলজিইডির প্রকল্পের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অবৈধভাবে নদী থেকে বালি উত্তোলন করছেন উত্তম কুমার। কোটি টাকার বালি এরই মধ্যে বিক্রিও করেছেন। অবশ্য এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের মাথাব্যথা না থাকলেও চেঙ্গী নদীর তীরের মানুষেরা রয়েছেন ঝুঁকিতে, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে পানছড়ির যাবতীয় ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ করছেন তারাই। স্থানীয় অন্যান্য ঠিকাদার ও রাজনৈতিক নেতারা এতে ফুঁসে উঠলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না কেউই।

স্থানীয় ও প্রশাসনের তথ্যমতে, পানছড়িতে সরকারিভাবে বৈধ কোনো বালুমহাল নেই। তাহলে কীভাবে মেশিন লাগিয়ে নদী থেকে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে? বৈধতার তোয়াক্কাও করেন না অরুণ আর উত্তম। পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ছাড়াই বালু উত্তোলনের ফলে প্রতি বছরই ভাঙছে চেঙ্গী নদীর তীর। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পাড়ের ফসলি জমি। তবুও বরাবরই নির্বিকার প্রশাসন। ম্যানেজ করে নাকি খুঁটির জোরে চলছে এসব, তা-ও অজানা।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী অরুণ কান্তি দাসের যোগসাজশে চেঙ্গী নদীর রাবার ড্যাম এলাকা থেকে গত আট মাস ধরে বিরামহীনভাবে বালি তুলেই চলেছেন স্থানীয় ঠিকাদার উত্তম কুমার দেব। ২০১০ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী কোনো ড্যাম এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বিপণনের উদ্দেশ্যে বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ। অথচ পানছড়ির উপজেলা প্রকৌশলী অরুণ দাস সাফাই গাইছেন ঠিকাদার উত্তমের পক্ষে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০২০-২১ অর্থবছরে টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ সেক্টর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চেঙ্গী নদীর ওপর ৮০ মিটার ড্যাম প্রকল্পে মেরামতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার ৯৮৮ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেসার্স রীপ এন্টারপ্রাইজের নামে কাজটি বাগিয়ে নেয় স্থানীয় উপ-ঠিকাদার উত্তম কুমার দেব।

প্রকল্পের কার্যাদেশে চেঙ্গী নদী থেকে পলি উত্তোলনের কথা বলা হলেও কার্যত তা হচ্ছে না। পলির বদলে রাবার ড্যাম সংলগ্ন এলাকা থেকে মেশিন বসিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি। সেসব বালি বিক্রি করা হচ্ছে পুরো উপজেলায়।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা যায়, পানছড়ি উপজেলায় সরকারি কোনো বালুমহাল নেই। সে হিসেবে বালি উত্তোলন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ চেঙ্গীর বুক থেকে প্রতিদিন মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সত্যতা মিলেছে সরেজমিন পরিদর্শনে। উত্তোলনকৃত বালি স্তূপ করা হয়েছে রাবার ড্যামের পাশেই। গত আট মাস ধরে এভাবে বালি উত্তোলন করলেও উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করেছেন কেবল একবার। এছাড়া বিনা বাধায় দেদার বালি উত্তোলন করায় লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

স্থানীয় ঠিকাদার উত্তম কুমার দেব পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি যুগ্ম সম্পাদক আর আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার দেব হলেন তার আপন বড় ভাই। প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউই মুখ খুলছেন না।

স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর থেকে রাবার ড্যামের নিচের অংশে মেশিন বসিয়ে বালি তোলা হচ্ছে। এখনো তা চলমান রয়েছে। এসব বালি গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি গাড়িতে অন্তত ১০০ ফুট বালি পরিবহন করা হয়। দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ গাড়ি বালি নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে।

এদিকে, অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কথা অকপটে স্বীকারও করেছেন উত্তম কুমার দেব। তিনি বলেন, এখানে কেবল আমি নই, অনেকেই অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে। আমার নিজের অনেকগুলো প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সেসব কাজের জন্য অনেক বালি প্রয়োজন হয়। উপজেলায় কোনো ঘাট (বালুমহাল) নেই। জেলা সদর থেকে বালি পরিবহন করে কাজ করা সম্ভব নয়।

অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের নেপথ্যে এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী অরুণ কান্তি দাসের যোগসাজশ রয়েছে। এ প্রকৌশলী বলেন, পানছড়িতে উত্তম বাবু বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছেন। অন্য ঠিকাদাররা তার কাজে ঈর্ষান্বিত।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পানছড়িতে আমাদের কোনো বালুমহাল নেই। কেউ যদি চেঙ্গী নদীর পানছড়ি অংশ থেকে বালি উত্তোলন করেন, তবে জেলা প্রশাসনকে জানান। অবৈধ বালি উত্তোলনকারী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।