২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ সংকট মেটাতে ছোট আকারের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়। এর পর থেকেই মূলত দেশের বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পদচারণা শুরু। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় অংকের অর্থও লগ্নি করেছেন তারা। যদিও এর বেশির ভাগই দেশী-বিদেশী ঋণ। বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্নের নিশ্চয়তা থাকায় এতদিন বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা ছিল বেশ আকর্ষণীয়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির নানামুখী সংকটে সরকারের তহবিলে টান পড়ায় আটকে গিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের বকেয়া অর্থ। ফলে ব্যবসা চালাতে নগদ অর্থ সংকটে পড়েছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে ছোট আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর টিকে থাকা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি সময় নিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্য ও বাজারভিত্তিক ব্যাংকের নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের অনেকেই এরই মধ্যে নগদ অর্থ সংকটে পড়েছেন। নগদ অর্থের অভাবে তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কেন্দ্র চালু রাখতে পারছেন না তারা। চরম অর্থ সংকটের মধ্যে পড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজলংকা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, এনার্জিপ্যাক পাওয়ার ভেঞ্চার লিমিটেড, এনা গ্রুপের নর্দার্ন পাওয়ার সলিউশন লিমিটেড, দেশ এনার্জি লিমিটেড ও হোসাফ গ্রুপের এইচএফ পাওয়ার লিমিটেড।

রাজলংকা পাওয়ারের এইচএফও/গ্যাসভিত্তিক ৫২ দশমিক ২ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নাটোরের বড়ভিটায় অবস্থিত। ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজলংকা পাওয়ার শ্রীলংকাভিত্তিক লাকধানাভি লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি। শ্রীলংকার বাইরে মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে।

এনার্জিপ্যাক পাওয়ার ভেঞ্চার লিমিটেডের অধীনে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে গ্যাসভিত্তিক ১১ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের পটিয়ায় এইচএফও-ভিত্তিক ১০৮ মেগাওয়াট ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১১৫ মেগাওয়াটের এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। হবিগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি, চট্টগ্রামের কেন্দ্রটি ২০১৫ সালের জানুয়ারি ও ঠাকুরগাঁওয়ের কেন্দ্রটি এ বছরের মার্চে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে বিদ্যুৎ বিক্রয়ে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি রয়েছে এ তিন কেন্দ্রের।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি হচ্ছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার ভেঞ্চার লিমিটেড। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হুমায়ুন রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের কাছে জ্বালানির মূল্য বাবদ আমাদের বড় অংকের অর্থ আটকে রয়েছে। এ বছরের মে মাসের পর আর অর্থ দেয়া হয়নি। ফলে আমরাও ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করতে পারছি না। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহে সংকট দেখা দিয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে জ্বালানির মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ও ব্যাংকের মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। যার ব্যবসা যত বড় তার ক্ষেত্রে এ ব্যবধান তত বেশি। এ অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদকরা বিপদে পড়ে যাবেন। কেউ কেউ খেলাপিও হয়ে যেতে পারেন। আমাদের কাছে অর্থ না থাকলে আমরা ব্যাংকের এলসি খুলতে পারব না। জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানির প্রাপ্যতা অনুযায়ী কেন্দ্র চালু বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আগামী দু-তিন বছর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হবে। ২০২৪ বা ২০২৫ সালের দিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আইপিপি খাতে আমাদের ব্যবসা তুলনামূলক ছোট। আমাদের বড় ব্যবসা হচ্ছে ট্রান্সফরমার ও সাবস্টেশন ইপিসি কন্ট্রাক্ট। এখানেও সরকার সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় আমরা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করতে পারছি না এবং প্রকল্পও সময়মতো হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হচ্ছি।’

এনা গ্রুপের মালিকানাধীন নর্দার্ন পাওয়ার সলিউশন লিমিটেডের অধীনে রাজশাহীর কাটাখালীতে ৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এটি ২০০৯ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন করা হয়। বিপিডিবির সঙ্গে কেন্দ্রটির ১৫ বছরের চুক্তি রয়েছে।

মোহাম্মদী গ্রুপের মালিকানাধীন দেশ এনার্জি লিমিটেডের অধীনে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিলেটের কুমারগাঁওয়ে ১০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এরই মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। দেশ এনার্জির অধীনে চাঁদপুরে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এইচএফও-ভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

হোসাফ গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি বিদ্যুৎ কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে এনার্জিপ্রিমা লিমিটেড ও ২০১৭ সালে এইচএফ পাওয়ার লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এনার্জিপ্রিমার অধীনে মোট ১৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক সিলেটের কুমারগাঁও ও হবিগঞ্জের শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্র দুটি ২০০৮ সালের জুলাই ও নভেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। ২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বগুড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১১ সালের নভেম্বরে এবং ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক ফেঞ্চুগঞ্জ সিলেটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। এনার্জিপ্রিমার সাবসিডিয়ারি এইচএফ পাওয়ারের অধীনে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে ১১৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার এইচএফও-ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সঙ্গে বিপিডিবির ১৫ বছরের বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি রয়েছে। এনার্জিপ্রিমার বগুড়ার কেন্দ্রটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপিডিবি বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো অর্থ সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় বিপিডিবির কাছে আমাদের যে বকেয়া রয়েছে সেগুলো দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। আগামী বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে সেটি পূরণের জন্য বিপিডিবি যে উদ্যোগ নিয়েছে সে বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

বিপিডিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৪৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু ছিল। এ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতা ২১ হাজার ৭১০ মেগাওয়াট। মেরামত ও মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে এ সময়ে ৬টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এ সময়ে ২৩টি কেন্দ্রে গ্যাসস্বল্পতা ও ৫টি কেন্দ্রে জ্বালানির স্বল্পতা ছিল। এ সময়ে পিক আওয়ারে গ্যাস ও তরল জ্বালানির স্বল্পতার কারণে ৩ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট এবং মেরামত ও বন্ধ থাকার কারণে ২ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ৯৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসে ১৩ কোটি, কয়লায় ১৬ কোটি ও তেলে ৬৬ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

একটি আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এইচএফও কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানির মূল্য বাবদ সরকারের কাছে ১৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। নিয়মানুসারে বিপিডিবির কাছ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিল পাওয়ার কথা থাকলেও আগে সাধারণত ৬০-৭০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা হতো। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ মাস পর বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। সাধারণত দু-তিন মাসের চলতি মূলধন হাতে নিয়ে ব্যবসা করি আমরা। তাই পাঁচ মাস ধরে বিল বাকি থাকলে কোনো ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। এছাড়া খুচরা যন্ত্রাংশ, লুব অয়েলসহ আনুষঙ্গিক সব উপকরণের দাম বেড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ১৮০ দিনের সময়সীমার মধ্যে এলসি করতে হয়। সময়মতো পেমেন্ট না পাওয়ায় এ এলসিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোয় বর্তমানে বাংলাদেশের নির্ধারিত সীমা কমে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই ডলারের অভাবে কিংবা লিমিটের অভাবে এলসি খুলতে পারছি না আমরা। এতে তেল আমদানিও কমে আসছে। ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করে নতুন এলসির জন্য লিমিট না নিলে ব্যাংকও আর এলসি খুলবে না। এ কারণে অনেক কোম্পানি জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছে না। সামনের মাস থেকে আমারও আর তেল আমদানি সক্ষমতা থাকবে না। বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের বড় আকারের বিনিয়োগ রয়েছে। এ অবস্থায় চাইলেই এ খাতের ব্যবসা ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অনেকেই স্থানীয় ও বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছে। ফলে সময়মতো অর্থ না পেলে তারা খেলাপি হয়ে পড়বে।’