দেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করছে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে পাঁচ উৎপাদন কোম্পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ মোট মজুদের অর্ধেকই রয়েছে সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফসিএল)। অথচ সেই তুলনায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সবচেয়ে কম। মূলত নতুন কূপ খনন না করা, পুরনো কূপ সংস্কার না হওয়া ও মজুদের তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদ না করায় এমনটা হচ্ছে বলে জানায় এসজিএফসিএল সূত্র।

পেট্রোবাংলার গ্যাস মজুদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মজুদকৃত গ্যাস ছিল সাড়ে নয় ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের (টিসিএফ) মতো। এর মধ্যে সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতায় পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রে মজুদকৃত গ্যাস ছিল প্রায় সাড়ে চার টিসিএফ বা ৪ হাজার ৪০৯ বিসিএফ (বিলিয়ন কিউবিক ফিট)। আর কোম্পানিটির আওতায় দুটি গ্যাসক্ষেত্রেই রয়েছে ৩ হাজার ৭৭০ বিসিএফ গ্যাস। অথচ পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে ৯ সেপ্টেম্বর এসজিএফসিলের গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) সরবরাহ ছিল যেখানে ৬১৩ মিলিয়ন, বাপেক্সের ১৪১ মিলিয়ন, শেভরনের ১ হাজার ৪১২ মিলিয়ন ও তাল্লোর সরবরাহ ছিল ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। জাতীয় গ্রিডে তাল্লোর সরবরাহ সবচেয়ে কম দেখানো হলেও মজুদের তুলনায় সেটি সিলেট গ্যাসফিল্ডের চেয়ে ঢের বেশি। কেননা তাল্লোর মজুদই আছে কেবল ১৯৮ বিসিএফ।

জ্বালানি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহৎ মজুদ থাকার পরও  এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানির আওতাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর কোনো উন্নয়ন কাজ করা হয়নি। তাই বছরের পর বছর জাতীয় গ্রিডে কোম্পানিটির গ্যাস সরবরাহ সবচেয়ে কম। সিলেট গ্যাসফিল্ডের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরে কোম্পানিটির উৎপাদন কমেছে ৩২ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোম্পানিটির দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল যেখানে ১৪১ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৯৭ মিলিয়ন ঘনফুটে। আর ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে এসজিএফসিএল গ্যাস সরবরাহ করেছে ৯১ মিলিয়ন ঘনফুট।

এসজিএফসিএলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, ২০১৬ সালের পর থেকে তাদের আওতাধীন কোনো গ্যাসফিল্ডে নতুন করে কূপ খনন বা সংস্কার হয়নি। উৎপাদন বাড়াতে বলার মতো কোনো প্রকল্পও নেয়া হয়নি। যে কারণে বছরের পর বছর গ্যাস উৎপাদন কমছে সংস্থাটির। অথচ কোম্পানির গ্যাস কূপে বিনিয়োগ করা গেলে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কনডেনসেট পাওয়া যেত বলে জানান এক কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, স্থানীয় সরবরাহ কত দ্রুত এবং কী পরিমাণ বাড়ানো যায়, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এরই অংশ হিসেবে সিলেট গ্যাসফিল্ডে আমাদের কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। কোম্পানিটির আওতায় বৃহদংশ গ্যাসের মজুদ রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এখান থেকে উৎপাদন বাড়ানোর। আশা করছি, এ উদ্যোগে আমরা সফল হব।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, এসজিএফসিএলের আওতায় যেসব গ্যাসফিল্ড রয়েছে সেগুলো ছয় দশক আগের পুরনো। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে এগুলো উৎপাদনে আসে। তাই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন একটি কূপ উৎপাদনে থাকলে তার গ্যাসের চাপ কমে যায়। কম্প্রেসার বসিয়ে গ্যাসের চাপ তৈরি করতে হয়, তাহলেই উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আওতায় গ্যাসফিল্ডগুলোর কূপ সংস্কারে বড় আকারে কিছু দেখা যায়নি। যেখানে বহুজাতিক কোম্পানি তাদের আওতাধীন গ্যাসফিল্ডগুলো কম্প্রেসার বসিয়ে গ্যাস উৎপাদন আগের অবস্থায় রেখেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের গ্যাস সংকটে সিলেট গ্যাসফিল্ডকে ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। কোম্পানিটির আওতায় গ্যাসফিল্ডগুলোর যথাযথ সংস্কার করা গেলে আরো বেশি গ্যাস পাওয়া যেত। এখন পেট্রোবাংলা গ্যাস উত্তোলনে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো আরো আগেই নেয়া উচিত ছিল। যে কাজটি শেভরন ঠিকই তাদের কূপে করেছে।

দেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ২০২৫ সাল নাগাদ ৪৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সময়ে ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতায় ছয়টি নতুন কূপ খনন এবং সাতটি কূপের সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও এসজিএফসিএল বলছে, তারা মোট ১৫-১৮টি কূপ খনন ও সংস্কার করবে। বাপেক্সের রিগের বাইরে ভাড়া করা রিগ দিয়ে এসব কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।

এ বিষয়ে এসজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ও কূপ সংস্কারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি আমরা। ২০২৩ সালকে লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে চারটি কূপের ওয়ার্কওভার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আগামী বছর নাগাদ আরো ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্তের পরিকল্পনা রয়েছে এসজিএফসিএলের। এরই মধ্যে আমরা বিয়ানীবাজার গ্যাসফিল্ডে কূপ খননকাজ শুরু করেছি।

আরো আগেই কেন এসব উদ্যোগ নেয়া হলো না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কূপ খনন বা সংস্কার হয়নি এমনটি বলা যাবে না। তবে কিছু কূপে কারিগরি জটিলতার কারণে ডাটা আপডেটের প্রয়োজন ছিল, যেটি এখন করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে পুরোদমে কাজ চলবে।

স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে গ্যাসকূপ খননে জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজের এক পোস্টে জানান, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য হিসেবে সিলেট ১০ নম্বর কূপ খননে চুক্তি স্বাক্ষর হলো আজ (রোববার)। ২০২৩ সালের মধ্যে এ কূপ থেকে দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে গ্রিডে।