পুরান ঢাকার পূর্বাংশের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম চ্যানেল ছিল যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী খাল। একসময় এ খাল দিয়ে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনি আখড়ার পানি শীতলক্ষ্যা ও বালু নদে গিয়ে পড়ত। আর বছরজুড়েই চলাচল করত ছোট-বড় নৌকা। সে অবস্থা আর নেই, দিনে দিনে দখল হয়ে খালের বুকে জেগেছে শত শত স্থাপনা। জীর্ণ অবস্থায় যেটুকু টিকে আছে, সেটিও যেন এখন আবর্জনার ভাগাড়। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশনের লোকজন গিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালেও মাস না ঘুরতেই আগের রূপ নেয় কুতুবখালী খাল। তাই এবার খালপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তাদের দাবি, কাজটি শেষ হলে সুন্দর পরিবেশ দেখে মানুষ আর খালে ময়লা ফেলবে না! যদিও কাজটি করার আগে কোনো রকম সমীক্ষা করা হয়নি, নির্ধারণ করা হয়নি খালের সীমানাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবেই তিলে তিলে সিটি করপোরেশনের হাতে বিলীন হয়েছে অনেক খাল। এবার সে তালিকায় যোগ হলো কুতুবখালী খালের শেষ অংশটুকুও।
বিভিন্ন সময়ের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, ২০০০ সালেও কুতুবখালী খালের প্রশস্ততা ছিল ৮০-১০০ ফুট। তবে খরস্রোতা খালটি ২০০১ সাল থেকে দখল হতে থাকে। ২০১০ সালে পুনরায় সেটিকে খনন করা হয়। তখন খালটির প্রশস্ততা নেমে আসে ১০-৩০ ফুটের মধ্যে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের রাস্তা নির্মাণের ফলে সেটি আরো সংকুচিত হয়েছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে ঢাকার সব খালের পাশেই ওয়াকওয়ে নির্মাণের কথা ভাবছে সিটি করপোরেশন। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে সংস্থাটি বলছে, সুন্দর পরিবেশ দেখে লোকজন আর খালে ময়লা ফেলবে না। সে লক্ষ্যেই কুতুবখালী খালপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। সেখানে ৮ দশমিক ৮৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১ দশমিক ২ মিটার প্রস্থের ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে খালের পাশে দেয়া হচ্ছে এক মিটার উঁচু গ্রিলের বেষ্টনী। থাকছে পাঁচটি স্টিলের বেঞ্চ ও ১৪৫টি বাতি। সব মিলিয়ে ব্যয় হবে ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
তবে খালপাড়ে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো সম্ভাবতা যাচাই করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। মেয়র মহোদয়ের (ফজলে নূর তাপস) মনে হয়েছে, এ ধরনের অবকাঠমো নির্মাণ করা হলে খাল দূষণ কমবে, তাই তিনি এ কাজের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আমরা এর বাস্তবায়নে কাজ করছি।
পূর্ব সমীক্ষা ছাড়াও সিটি করপোরেশনের এ কাজে সবচেয়ে বড় ভুল খালের সীমানা নির্ধারণ না করা। ফলে বর্তমানে বানানো অবকাঠামো পরবর্তী সময়ে ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হবে। সীমানা নির্ধারণ না করে ও কোনো সমীক্ষা ছাড়া ওয়াকওয়ে নির্মাণের ফলে কুতুবখালী খালের দখল আরো বাড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঢাকার খাল নিয়ে আমরা বেশকিছু কাজ করেছি। সেখানে দেখেছি, সিটি করপোরেশনের রাস্তা নির্মাণের ফলে অনেক খাল অস্তিত্ব হারিয়েছে। কিছু খাল কেবল বড় ড্রেনের আকারে টিকে আছে। কতুবখালী খাল তারই একটি। তাই সিটি করপোরেশনের প্রথম কাজ হলো খালের সীমানা নির্ধারণ করা। উচ্চ আদালতও এ নিয়ে রায় দিয়েছেন। সীমানা নির্ধারণ করতে হবে সঠিকভাবে। এসব না করে খালের জায়গাতেই ওয়াকওয়ে বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ আসলে খালটিকেই মেরে ফেলার পদক্ষেপ বলে মনে করি।
খালের দখল উচ্ছেদ করে সীমানা নির্ধারণের কথা বলেছেন নগরবিদ ইকবাল হাবিবও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমরা ধানমন্ডি লেক করেছি। তার পাশেও তো ওয়াকওয়ে আছে। সেখানে বেষ্টনী দিতে হয়নি। আবার হাতিরঝিলে ওয়াকওয়ের পাশে বেষ্টনী দিয়েছি। তাই কোথায় বেষ্টনী দিতে হবে আর কোথায় হবে না, সেটা
সমীক্ষা না করে হুট করে কোনো পদক্ষেপ নেয়া তো বোকামি। সিটি করপোরেশন যে কাজ করছে সেটা ভালো উদ্যোগ হতো, যদি এতে খালটির দখল ও দূষণ কমত। তিনি আরো বলেন, এখন তো খোদ সিটি করপোরেশনই নানাভাবে খাল দখল করে ফেলছে। খালপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ দখলেরই অংশ বিশেষ।
দূষণমুক্ত রাখতে খালপাড়ে বেষ্টনী নির্মাণ প্রসঙ্গে এ নগর পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, খাল দূষণমুক্ত করতে হলে এক মিটার বেষ্টনী কোনো কাজেই আসবে না যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা না হয়। সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে হবে। কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পর সীমানা নির্ধারণ করে খালপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করলে এবং নৌরুট সচল করতে পারলে দূষণ এমনিতেই কমে আসবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা খালপাড়ে সাময়িক বেষ্টনী দিয়ে দেখেছি, মানুষ ময়লা ফেলে না। তার পরই ওখানে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শুরু করি। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য খালপাড়েও ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও বেষ্টনী দেয়া হবে। খালের সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কুতুবখালী খালের সীমানা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। ফলে খালটি দূষণমুক্ত রাখতে প্রাথমিকভাবে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে বেষ্টনী দিচ্ছি। পরবর্তী সময়ে সীমানা নির্ধারণ করে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করব।










