গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীতে অতিবর্ষায় দুই এলাকায় পাহাড় ধসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড় ও পাদদেশে অবৈধ বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়। তবে জোরালো উদ্যোগ কম। বরং দুর্ঘটনা ঘটলে তখনই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

ফিরোজশাহ এলাকায় আদালতে রিট আবেদন থাকায় সেখানে উচ্ছেদ চালাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উচ্ছেদও চালানো যাচ্ছে না। কিছু পাহাড় থেকে উচ্ছেদ পরিচালনা করলেও সাময়িকভাবে কেউ চলে গেলেও বর্ষা মৌসুম শেষ হলে তারা আবার ফিরে আসে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, শুক্রবার রাতে পূর্ব ফিরোজশাহের ১ নং ঝিল এলাকার যেখানে পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে অভিযানের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রিট শুনানি চলছে। এমনকি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলে সর্বোচ্চ ৭০০ পরিবার (রেকর্ড অনুযায়ী) বসবাস করছে, সেখানেও আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় চাইলেও প্রশাসন উচ্ছেদ চালাতে পারছে না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহানগরীর ৬৫ পাহাড়ের মধ্যে ৩৪ পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২১ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন পাহাড় ও এর পাদদেশে অন্তত ১ হাজার ৮৭০টি পরিবার বাস করছে। তবে বাস্তবিক আরো বেশি মানুষ ষেখানে বাস করে।

২০০৭ সালের ১১ জুন পাহাড়ধসে ১২৭ জন মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো তদারকি এবং প্রাণহানি রোধে চট্টগ্রামের তত্কালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার এমএন সিদ্দিককে প্রধান করে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ সময় গঠন হয় ১৮ সদস্যের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। কিন্তু গত ১৫ বছরে শুধু বর্ষা মৌসুমে বৈঠক আয়োজন আর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ কমিটির কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামের পূর্ব ফিরোজশাহের ১ নং ঝিল এলাকায় আমরা রোববার (গতকাল) দিনব্যাপী অভিযানে ১৪৫টির বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি। পাহাড়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সেখানে পুনরায় কেউ যাতে দখলে নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারে সেজন্য কাঁটাতার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে গাছ লাগানো হবে। যদি কেউ এ সীমানা ভেঙে বসতি গড়ে তোলে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্ষা মৌসুম আসার আগেই আমরা এ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করেছি, উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তারা আবারো ফিরে আসে। আমরা স্থায়ী সমাধানের জন্য চসিক ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছি।

এদিকে মতিঝর্ণা ও পূর্ব ফিরোজশাহ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, শনি ও রোববার টানা দুইদিন ধরেই জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এ এলাকায় সচেতনতার জন্য মাইকিং করছেন। কয়েক দিন আগেও মাইকিং ও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বর্ষা মৌসুমের আগেই পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরে যেতে বলা হলেও তারা কোনো কথাই শোনে না। এমনকি তারা চলে গেলেও আবার ফিরে আসে।

২০০৭-২২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ২০০৭ সালে। ওই বছরের ১১ জুন টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে মারা যায় ৩০ জন। এছাড়া প্রতি বছর চার-পাঁচজনের বেশি মানুষ পাহাড়ধসে মৃত্যুবরণ করছে।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীরা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। শুক্রবার রাতেও কাউন্সিলর ঘরে তালা মেরে দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তারা আবার সকালে ফিরে এসেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, যারা পাহাড়ে অবস্থান করছে তারা খুবই অল্প আয়ের মানুষ। পাহাড়ে মৃত্যুঝুঁকি আছে জেনেও অল্প টাকায় মাথা গোজার ঠাঁইয়ের জন্য তারা এখানে বসবাস করছে। তাছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের ছত্রচ্ছায়ায় ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে এসব মানুষ।