দেশে অতিপ্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, দাম নিয়ে কারসাজি প্রতিরোধে সরকারিভাবে পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। কয়েক বছর ধরে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে আসছে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পণ্যবাজারে অস্থিরতার কারণে আট মাস আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নয়টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন না করায় বহির্বিশ্বে দাম কমলেও দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল হয়নি।

২০২২ সালের ৩০ আগস্ট সচিবালয়ে দ্রব্যমূল্য-সংক্রান্ত বৈঠকে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের অতিপ্রয়োজনীয় নয়টি পণ্যের দাম নির্ধারণের ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। নির্ধারিত ওই নয়টি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, ডিম, রড ও সিমেন্ট। গমের মধ্যে আটা ও ময়দা, ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম অয়েল ও সয়াবিন দুই ধরনের পণ্যই রয়েছে। তবে ওই ঘোষণা বাস্তবায়নে এখনো তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও দেশে কমেনি বরং কিছু পণ্যে দাম উল্টো বেড়েছে। ডলার ও এলসি সংকট, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতসহ নানা কারণ দেখিয়ে এখনো বাড়তি দামেই পণ্য বিক্রি করছেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্যের দাম নির্ধারণসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করে মূলত বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) মাধ্যমে। আমদানি তথ্য পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানিকারকদের আবেদন কিংবা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে দাম নির্ধারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর ধরে ভোজ্যতেল (পাম অয়েল কিংবা সয়াবিন তেল) ও চিনির দাম নির্ধারণ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ দুটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণ করলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে এর প্রভাব মিলছে না। মূলত দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পর প্রশাসনিক বা মনিটরিং কার্যক্রমের অভাবে এ দামের সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তা সাধারণ। তাছাড়া ঘোষণার প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও দাম নির্ধারণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমদানিকারক ব্যবসায়ীরাও ইচ্ছামাফিক দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেল, চিনিসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হলেও দাম কমানোর সময় এলেই অনেকটা চুপ থাকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের ৩০ আগস্টের সভা সূত্রে জানা যায়, আমদানিসংক্রান্ত পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিটিটিসির আমদানি মূল্য পর্যালোচনাসাপেক্ষে দাম নির্ধারণের তথ্য দেবে। তাছাড়া দেশে উৎপাদন হয় এমন কৃষিজ পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় দাম নির্ধারণের সুপারিশ করবে। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এসব সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করবে। এরই মধ্যে বিটিটিসি ভোজ্যতেল, চিনির পাশাপাশি রড ও সিমেন্টের দাম নির্ধারণসংক্রান্ত প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এর পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রড ও সিমেন্টের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ক্রমাগতভাবে বাজারে এ পণ্যগুলোর দাম বেড়েই চলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রুহুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেল ও চিনি ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্যান্য পণ্যের দাম নির্ধারণ করে না। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা সেটি আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নয়টি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের (ভোজ্যতেল ও চিনিসহ) দাম নির্ধারণের বিষয়টি সেভাবে জানেন না বলে জানান। তবে বিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর বিটিটিসি থেকে রড ও সিমেন্টের দাম নির্ধারণসংক্রান্ত প্রতিবেদন দেয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সাধারণ ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অভিযোগ, কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে এ সুযোগে চলতি রমজান, আসন্ন ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন বেশি চাহিদার মৌসুমকে কেন্দ্র করে আমদানিকারকরা অতিমুনাফার লোভে বাড়তি দামেই পণ্য বিক্রি করছেন।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে দাম কমেছে এটা সত্য। তবে দেশের ডলার সংকট, একাধিক দামে ডলার ক্রয়ের কারণে ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। চিনির দাম নির্ধারণ করলেও বেশি দামে চিনি বিক্রি হচ্ছে। আমদানি, রফতানি, এলসি মূল্য, রেমিট্যান্স—এ চার ধাপে চার ধরনের ডলার মূল্য দেশের বাণিজ্যকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলে সমস্যা নেই, তবে অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করা না গেলে বেঁধে দেয়া দামও কাজে আসবে না।’

বিশ্বব্যাংকের ভোগ্যপণ্যসংক্রান্ত সর্বশেষ (৪ এপ্রিল ২০২৩) পিংক শিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈশ্বিক পণ্যের দাম ক্রমান্বয়ে কমছে। খাদ্যপণ্য ছাড়াও জ্বালানি, সার, কেমিক্যাল, ধাতব পণ্যের দাম গত এক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের জানুয়ারি-মার্চে অপরিশোধিত পাম অয়েলের টনপ্রতি গড় দাম ছিল ১ হাজার ৫৪৮ ডলার, যা সর্বশেষ মার্চে এসে ঠেকেছে ৯৭২ ডলারে। একই সময়ে সয়াবিনের দাম ১ হাজার ৬৭৪ ডলার থেকে কমে সর্বশেষ মার্চে নেমে এসেছে ১ হাজার ১১৩ ডলারে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে চালের দাম ছিল টনপ্রতি ৫০০ ডলারের বেশি। বর্তমানে তা প্রায় ৫০ ডলার কমে লেনদেন হচ্ছে ৪৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৪৭৫ ডলারে। গমের দাম ২০২২ সালের জানুয়ারি-মার্চে ছিল টনপ্রতি ৩৭০ থেকে ৪১৭ ডলার। গমের দাম কমে লেনদেন হয়েছে মার্চে ২৮৪ থেকে ৩৬৯ ডলারে। অপরিশোধিত চিনির দাম প্রতি পাউন্ডে ৩৭ সেন্ট থেকে কমে সর্বশেষ মার্চে লেনদেন হয়েছে ৩৫ সেন্টে। অন্যদিকে ২০২২ সালের জানুয়ারি-মার্চে আয়রন ওরির টনপ্রতি ১৪২ দশমিক ৫ ডলারে লেনদেন হলেও মার্চে একই মানের আয়রনের দাম নেমে এসেছে ১২৮ দশমিক ৪ ডলারে। ভোজ্যতেলসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে শুধু ভোজ্যতেল ও চিনির দাম নিয়েই কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ঘোষণার পরও অন্যান্য পণ্যের দাম নির্ধারণ না করায় আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা নিজেদের নির্ধারিত দামেই বাজারে পণ্য সরবরাহ করছেন।

বিটিটিসির বাণিজ্য নীতি বিভাগের উপপ্রধান (চলতি দায়িত্ব) মো. মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্যারিফ কমিশন নিয়মিতভাবে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম নির্ধারণের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরো বেশকিছু পণ্যের দাম নির্ধারণের জন্য ঘোষণা দেয়ার পর আমরা রড ও সিমেন্টের বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। ট্যারিফ কমিশন দাম নির্ধারণের ঘোষণা দেয় না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর সেখান থেকেই পণ্যের দাম নির্ধারণের বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হয়।’

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর দেশে ভোজ্যতেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই সময়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৩-৫ টাকা কমিয়ে ১৮৭ টাকা করা হয়। এছাড়া খোলা সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১৭২ থেকে কমিয়ে ১৬৭ এবং পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১২১ থেকে কমিয়ে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরই মধ্যে পাম অয়েল ও সয়াবিনের দাম এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমলেও দেশের বাজারে পণ্যটির দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া গত ৬ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিনির দাম পুনর্নির্ধারণ করে। নতুন দরে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০৪ ও প্যাকেটজাত চিনি ১০৯ টাকায় বিক্রি হবে। এর আগে একই মানের চিনির দাম ছিল যথাক্রমে ১০৭ ও ১১২ টাকা।

সরকারি বাজারসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ে কাজ না করলে বেঁধে দেয়া দামই বাজার নিয়ন্ত্রণে শতভাগ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার, প্রতিযোগিতা কমিশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো দেখভাল না করলে নিত্যপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মজুদ, মুনাফালোভী সিন্ডিকেট বাজারকে অস্থিতিশীল করলেও শাস্তির আওতায় আসে না। এ কারণে সরকার দাম নির্ধারণ করলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায় না। সরবরাহ দিয়ে সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালনকারী সংস্থাগুলোও (টিসিবি) ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যে কারণে হয়তো কয়েকটি পণ্যের পর বাকি নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘ওপেন মার্কেট সেল বাড়ানো ছাড়াও কারসাজি ও অতিমুনাফার সঙ্গে যুক্তদের কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা উচিত। এছাড়া নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কর সুরক্ষা মাধ্যমে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীলতায় আনা দরকার। দাম নির্ধারণের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে সরকার কঠোর অবস্থানে না থাকলে অতি নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’