একটি শিশুর সাক্ষরতার প্রথম ধাপ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিকের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনে পদার্পণ করে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকার বাধ্যতামূলক করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তিও দিচ্ছে। এসব সুবিধা দেয়ার পরও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অথচ শিক্ষকদের বেতন ও উপবৃত্তি মিলিয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারের মাসিক খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। গত পাঁচ বছরে মিরসরাই উপজেলায় ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বাড়লেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় আট হাজার। সরকারি এত সুযোগ-সুবিধার পরও কেন প্রাথমিকে কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ গ্রামে গড়ে ওঠা নূরানী মাদ্রাসা ও কেজি স্কুল। অনেক অভিভাবক এখন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

জানতে চাইলে মিরসরাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি ডা. জামশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ নূরানী মাদ্রাসা। গত কয়েক বছরে মিরসরাইয়ের গ্রাম পর্যায়ে বেশকিছু নুরানী মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। অভিভাবকও মাদ্রাসানির্ভর হয়ে পড়ছেন।’

মিরসরাই উপজেলা প্রাথমিক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৯১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৩২ হাজার। এসব শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ শিক্ষক। পাঁচ বছর আগে উপজেলায় ১৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিল ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু এখন ছয়টি বিদ্যালয় বাড়লেও বাড়েনি শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বরং আরো কমেছে। ১৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী রয়েছে করেরহাট ইউনিয়নের দৌলতবিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয়ে রয়েছে মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী।

২০১৮ সালে মিরসরাই উপজেলার ১৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৪১ হাজার ৩৬০ জন। ২০১৯ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৪০ হাজার ৫৭০ জন। এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৭৯০ জন। ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৩৯ হাজার ৯৮০ জন। এক বছরে কমেছে ৫৯০ জন। ২০২১ সালে ছিল ৩৬ হাজার ২৮৭ জন। এক বছরে কমেছে ৩ হাজার ৬৯৩ জন। ২০২২ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৩২ হাজার ৭৬৫ জন। বছর শেষে কমেছে ৩ হাজার ৫৫২ জন। বর্তমানে ১৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩২ হাজার। সে হিসাবে এক বছরে কমেছে ৭৬৫ জন।

এদিকে ১ হাজার ১৮৫ শিক্ষক মাসে বেতন বাবদ উত্তোলন করেন ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া উপবৃত্তি পায় ২৭ হাজার পরিবার। সব মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে প্রতি মাসে সরকারের খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা।

সরকারি স্কুলের বিপরীতে মিরসরাইয়ে রয়েছে ৬০টি কেজি স্কুল। এসব স্কুলে রয়েছে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী। মানভেদে কেজি স্কুলে শিক্ষার্থীপ্রতি মাসিক বেতন নেয়া হয় ৩০০-৪৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু কেজি স্কুলগুলোয় পাঠদানে কোনো অবহেলা কিংবা ছাড় দেয়া হয় না বলে দাবি করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক। তাদের দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় বিভিন্ন সরকারি অনুদান দেয়া হয়। যা কেজি স্কুলগুলোয় দেয়া হয় না। এছাড়া কেজি স্কুলে পাঠদানে কোনো প্রকার ফাঁকি দেন না শিক্ষকরা। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় কেজি স্কুলের মতো দায়িত্ব নিয়ে পাঠদান করানো হয় না। অথচ কেজি স্কুলের চেয়ে প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বেশি। এছাড়া  যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে নূরানী মাদ্রাসা। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও পেছনে রয়েছে মাদ্রাসা। তাই অভিভাবক প্রাথমিকের চেয়ে নূরানী মাদ্রাসা ও কেজি স্কুলকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অভিভাবক মাদ্রাসা ও কেজি স্কুলনির্ভর হয়ে পড়ছেন। তাই দিন দিন প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে আমরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি।’