কভিড-১৯ মহামারীতে উড়োজাহাজ পরিবহন খাত সব থেকে বিপর্যস্ত হয়। দুই বছর পর মহামারীর প্রকোপ কিছুটা স্তিমিত হলেও এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সংশ্লিষ্ট খাতটি। উপরন্তু কর্মী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে মরিয়া হয়ে কর্মীর সন্ধান করছে উড়োজাহাজ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। পাইলট, কেবিন ক্রুসহ অন্যান্য কর্মীর পাশাপাশি যে সংকট তীব্রতর হয়ে উঠছে তা হলো মেকানিকের স্বল্পতা। নজর এড়িয়ে গেলেও এর ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে উড়োজাহাজ শিল্প খাতে জড়িত সংস্থাগুলো।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গত দুই বছর দুর্দিন পার করেছে এয়ারলাইনস খাত। দুঃসময় পার করে বর্তমানে নতুন সংকট হাজির হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মুখে। শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে চরম সংকট। আগামীকাল থেকে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের সন্নিকটে শুরু হচ্ছে ফার্নবরো এয়ারশো। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুষ্ঠানটিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হবে কর্মী সংকট।

কেবিন ক্রু সংকট ঘিরে সম্প্রতি একাধারে ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। একই সঙ্গে মেকানিক সংকটও দেখা দিয়েছে। নেভিও কনসালট্যান্সির মতে, চলতি বছর রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও উড়োজাহাজ পরীক্ষার জন্য প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যিক মহাকাশ সংস্থা জিএ টেলেসিস এলএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবডোল মোয়াবেরি বলেন, আমরা চরম সংকটে ভুগছি। আমরা যথেষ্ট কর্মী পাচ্ছি না।

মেকানিক সংকটে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংও। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী দুই দশকে বৈশ্বিক উড়োজাহাজ শিল্পে মোট ৬ লাখ ২৬ হাজার নতুন রক্ষণাবেক্ষণকারী টেকনিশিয়ান লাগবে। প্রয়োজন হবে ৬ লাখ ১২ হাজার পাইলটের।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রকৌশলীদের অভাবে ফ্লাইট বাতিল অথবা বিলম্বিত হওয়ার সময় আরো প্রলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মহামারীতে কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে অনেক কর্মীই অটোমোবাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। অন্যদিকে এ কর্মীদের অভাব পূরণ করতে যথেষ্ট পরিমাণে স্নাতক শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না।

এভিয়েশন টেকনিশিয়ান এডুকেশন কাউন্সিলের (এটিইসি) তথ্য বলছে, কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ টেকনিশিয়ান স্কুলে নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। অথচ ২০১৯ সালে এ হার ছিল ১৩ শতাংশ।

এ বিষয়ে লুফথানসা টেকনিক এজির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রধান কর্মকর্তা ফ্রাংক বায়ের বলেন, মহামারীপূর্ব সময়ের তুলনায় বর্তমানে মেকানিক নিয়োগ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশের উড়োজাহাজ শিল্প খাতেও একই দশা। কানাডার ক্যাসকেড অ্যারোস্পেস মূলত সামরিক উড়োজাহাজ মেরামত করে। ক্যাসকেড অ্যারোস্পেসের নির্বাহী কর্মকর্তা স্কট ক্যাডওয়েল বলেন, মহামারীকালে সংস্থাটি বছরে মাত্র ১০০ জন কর্মী নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছিল।

কানাডার কুইবেক প্রদেশস্থিত অ্যারো মন্ট্রিয়লের প্রেসিডেন্ট সুজান বেনোইট বলেন, দুই বছর বা তিন বছরে যদি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হয়, তরুণরা যদি এ খাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে আমরা সময়মতো আমাদের পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হব।

মেকানিকদের তুলনায় পাইলটদের বেতন অনেক বেশি। পাইলটদের আয় লাখের ঘরে। অন্যদিকে মেকানিকদের আয় সে তুলনায় নগণ্য। প্রায়ই লেট শিফটেও কাজ করতে হয় কর্মীদের। বিশেষজ্ঞদের মত, দ্রুত এ খাতে কর্মীদের বেতন ও মর্যাদা বাড়াতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়বে উড়োজাহাজ শিল্প খাত।