দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন খাতে সৃষ্ট কর্মী সংকট মেটাতে রোবটের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সরবরাহ-সংশ্লিষ্ট খাত ও রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত কর্মী সংকট বেড়ে যাওয়া ও ন্যূনতম বেতনের পরিমাণ বাড়ার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো রোবট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে। নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দেশটির বড় বড় লজিস্টিক পরিষেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের কাজে রোবট ব্যবহার করছে। পাশাপাশি একটি বড় খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় রোবট ব্যবহার করে গ্রাহকের কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবেও বেড়েছে রোবটের ব্যবহার।

সিউলের কাছের গানপো শহরের একটি ভবনে অবস্থিত সিজে লজিস্টিকের পণ্যাগার। এখান থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি অনলাইন খুচরা বিক্রেতার পণ্য সরবরাহ করা হয়। সেখানে থাকা মালপত্র রাখার তাকগুলো সচল। প্রতিটি তাকের উচ্চতা ২৭৮ সেন্টিমিটার, যেগুলো স্বাধীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় তলায় পৌঁছে যাচ্ছে। সাত হাজার বর্গমিটার আয়তনের অফিসে ৬৩০টি তাক রয়েছে। মোট ১০১টি রোবট এসব তাক মালপত্রে পরিপূর্ণ করে সেগুলো সরিয়ে নিতে সহায়তা করছে।

প্রথাগত ব্যবস্থায় একজন কর্মী এসব তাক থেকে নির্ধারিত পণ্য বেছে নিয়ে সেগুলো গ্রাহকের অনলাইন কার্টে যুক্ত করতেন। যেখানে সময়ও বেশি লাগত, অনেক কর্মীও প্রয়োজন হতো। সিজে লজিস্টিক সে ব্যবস্থাই পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন কর্মীরা মালামালের তাকের কাছে নয়, বরং তাকই মালপত্রসহ কর্মীদের কাছে চলে আসছে।

যখন একজন কর্মী ক্রেতার ক্রয়াদেশ কম্পিউটার সিস্টেমে ইনপুট দেন, তখন তার কাঙ্ক্ষিত পণ্যযুক্ত তাকটি প্যাকেজিং এলাকায় চলে যায়। সেখান থেকে নির্দিষ্ট পণ্যটি নিয়ে প্যাকেজিং শেষে তা পাঠিয়ে দেয়া হয় ক্রেতার কাছে।

সিজে লজিস্টিকের গবেষণাগারে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি সেগুলো নির্দিষ্ট তাকে রাখা হয়। আবার কিছু পণ্য আছে যেগুলো ক্রেতারা সাধারণত একসঙ্গে অর্ডার করেন বেশি, সেগুলো একসঙ্গে এক তাকে রাখা হয়। এভাবে পণ্য সন্নিবেশ করার কারণে কাজটি অনেক দ্রুত ও সহজে হয়ে যায়।

সিজে লজিস্টিক বলছে, পণ্য সন্নিবেশের এ পদ্ধতির কারণে কর্মীদের কাজের সময় অনেক কমে গিয়েছে। তারা আগের চেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেন। একজন কর্মী ১ ঘণ্টায় ২৩ দশমিক আটটি পণ্য প্যাকেট করতে পারেন। আগে যা ছিল ১৫ দশমিক ৪, অর্থাৎ একজন কর্মীর কর্মদক্ষতা আগের চেয়ে বেড়েছে ৫৫ শতাংশ।

এ লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ধরনের পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফেস মাস্ক, ডিটারজেন্ট ও শিশুদের বিভিন্ন পণ্যও। নতুন পদ্ধতিতে এসব ছোটখাটো পণ্য সরবরাহেও আগের চেয়ে সময় কম লাগে। এ ব্যবস্থা চালুর ফলে পণ্য পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের খরচ অনেক কমে গিয়েছে। সচল এ তাকের ব্যবস্থা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চায় সিজে লজিস্টিক।

কেবল প্যাকেজিং খাতেই নয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় রোবটের ব্যবহার বেড়েছে রেস্তোরাঁ খাতেও। ওয়েটার হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে রোবট। এসব রোবট ভোক্তার টেবিলে পৌঁছে দেয় প্রয়োজনীয় খাবার। আবার রাঁধুনী রোবট ব্যবহার হচ্ছে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে। একটি রোবট ১ ঘণ্টায় ৫০ টুকরো চিকেন ফ্রাই ভাজতে পারে। আবার দেশটির জনপ্রিয় খাবার তেওকবক্কি তৈরি করতে পারে মাত্র ১০ মিনিটে।

সম্প্রতি সিউলের একটি রেলস্টেশনে কফি সরবরাহকারী রোবট কাজ শুরু করেছে। ছোট একটি মনুষ্যবিহীন রেস্তোরাঁয় আগত ক্রেতাদের কাছে কফি সরবরাহ করা হয় একেবারে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে।

দক্ষিণ কোরিয়ার উর্বরতার হার বিশ্বে সবচেয়ে কম। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির জনসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব রোবটের ব্যবহার দেশটির কর্মী সংকটের ক্ষেত্রে সমাধান দিচ্ছে।