যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুনেও দেশটির মূল্যস্ফীতি চার দশকের সর্বোচ্চ উচ্চতায় রয়ে গিয়েছে। কারণ গ্যাস, খাদ্য ও বাড়ি ভাড়া ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আক্রমণাত্মকভাবে সুদের হার বাড়াতে চাপ দিচ্ছে। ফলে মন্দার ঝুঁকিও বাড়ছে। খবর এপি।
গত মাসে সরকারের ভোক্তা মূল্য সূচক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এ হার ১৯৮১ সালের পরে সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি। জুনের মূল্যস্ফীতিতে অর্ধেক অবদানই উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বিশেষত নিম্ন-আয়ের, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক মার্কিনরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের আয়ের একটি বড় অংশ পরিবহন, আবাসন ও খাবারের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। অনেক পণ্য ও পরিষেবার মূল্য গড় আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ার কারণে মার্কিন নাগরিকদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন রুটিনে বিপর্যয়কর প্রভাব অনুভব করছে।
যেমন ৭২ বছর বয়সী মার্সিয়া ফ্রিম্যান ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি চাকরি থেকে অবসন নিয়েছেন এবং পেনশনের অর্থে জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, স্টোর ব্র্যান্ডের মতো সস্তা আইটেমসহ সবকিছুর মূল্যই বেড়ে গিয়েছে। মুদির খরচ নিয়ন্ত্রণে চলতি সপ্তাহেও আমাকে ফুড ব্যাংকে যেতে হয়েছে। মুদির দাম এক বছরে ১২ শতাংশ বেড়েছে। এ বাড়ার হারও ১৯৭৯ সালের পরে সর্বোচ্চ।
মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হওয়ার বিষয়টি ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন দশকের মধ্যে দ্রুততম হারে সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। এ পদক্ষেপ ভোক্তা ও ব্যবসার জন্য ঋণগ্রহণ ব্যয়বহুল করে তুলেছে এবং এটি ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মার্কিন অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকেও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
ক্রোল ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক প্রধান অর্থনীতিবিদ মেগান গ্রিন বলেন, যে লক্ষ্য নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াচ্ছে, তা পূরণ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ পদক্ষেপ চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এ পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করা হলে আমাদের মন্দায় পড়তে হবে।
চলতি মাসের শেষ দিকে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি সুদের হার তিন-চতুর্থাংশ পয়েন্ট বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত মাসেও একই হারে বাড়ানো হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে ভোক্তা আস্থা কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসনাল নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক হুমকি তৈরি হচ্ছে। জুনে এপি-এনওআরসি জরিপে উঠে এসেছে, ৪০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক মনে করেন চলতি বছর মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা করা একটি শীর্ষ সরকারি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। গত ডিসেম্বরেও এমন মতামত দিয়েছিল মাত্র ১৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
বছরের পর বছর কম দামের পরে ২০২০ সালে মহামারীজনিত মন্দা কাটিয়ে পর্বতসম চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা এ দামকে ত্বরান্বিত করে। সর্বশেষ ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পণ্য মূল্য আরো বেড়ে গিয়েছে। গত কয়েক মাস ভোক্তা ব্যয় ধীরে ধীরে পণ্য থেকে পরিষেবায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। তবু মূল্য কমার পরিবর্তে আসবাবপত্র, গাড়ি ও অন্য পণ্যের মূল্য বাড়ছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁর খরচ, ভাড়াসহ অন্য পরিষেবাগুলো আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।









