শুল্ক ফাঁকির দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার পরও থামছে না মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি-রফতানি। ওজনে কম-বেশি দেখানো, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনা ও মূল্য কম দেখানোর মতো মিথ্যা ঘোষণায় প্রতিনিয়ত নানা পণ্য দেশে আসছে কিংবা বিদেশে যাচ্ছে। এতে স্টেশনগুলোয় বাড়ছে জরিমানা ও মামলার সংখ্যা। চলতি অর্থবছরের গত চার মাসে (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজেই এ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬৭টি। আর জরিমানা আদায় হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩ সালের চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের অনিয়মের আংশিক চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে দামি পণ্য এনে একদিকে শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে আমদানি করে বিদেশে ডলার পাচার হচ্ছে। কাস্টম হাউজগুলোর কঠোর নজরদারির কারণে প্রতি মাসে মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্যের ১৫ থেকে ২০টি চালান আটক করছেন তারা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আমদানি ও রফতানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মে এ শুল্ক স্টেশনে গত তিন মাসে দায়ের করা ৬৭টি মামলার মধ্যে ২৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে। অধিকাংশ মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। যেসব মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে সেখান থেকে ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ।

এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাস্টম হাউজগুলোতে প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মিথ্যা ঘোষণার একাধিক কারণে এসব মামলা দায়ের করা হয়ে থাকে। মামলা দায়ের হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, রফতানির করার সময় ওজনে কম-বেশি থাকলে মিথ্যা ঘোষণা দেখিয়ে জরিমানা ও পণ্য আটকিয়ে রাখা হয়। যেহেতু অনেক রফতানিই শুল্কমুক্ত, তাই এখানে এনবিআরের তেমন কোনো রাজস্ব ক্ষতি হয় না। তাই এসব পণ্য আটকিয়ে রেখে মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে সময়ক্ষেপণ ও জরিমানা করার উল্লেখযোগ্য কোনো কারণ নেই। তাই এসব ক্ষেত্রে এনবিআরের আরো বেশি বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু যারা এক পণ্য ঘোষণা দিয়ে আরেক পণ্য আনে বা বন্ড সুবিধায় পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয় তাদের ক্ষেত্রে এনবিআর কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।

এদিকে, সম্প্রতি বিল্ডিং এ রেজিলিয়েন্ট ইকোনমি ফর ভিশন ২০৪১: কি চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড শীর্ষক দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) আলোচনা অনুষ্ঠানের এনবিআরের কাস্টমস পলিসির সদস্য মাসুদ সাদিক বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সঠিক দামের ঘোষণা দিলে এনবিআরের মিনিমাম ট্যারিফ ভ্যালু নির্ধারণ করতে হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান ১৪ হাজার কেজি পণ্যের ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু কায়িক পরীক্ষা দেখা গেছে সেখানে ছয় হাজার কেজি মালামাল আছে। এজন্য এনবিআরের এ সদস্য সঠিক ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান ব্যবসায়ীদের প্রতি।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কনটেইনারের চেহারা ও প্রতিষ্ঠানের নাম দেখেই পণ্য সম্পর্কে সবকিছু বোঝা যায় না, এজন্য কায়িক পরীক্ষা করতে হয়।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের উপকমিশনার ব্যারিস্টার মো. বদরুজ্জামান মুন্সী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এইচএস কোড, সিপিসি, পরিমাণে কম-বেশি বা অন্য কোনো মিথ্যা ঘোষণা হলে সেসব ক্ষেত্রে কাস্টমস আইন অনুযায়ী ২০০ শতাংশ জরিমানা করা হয়। এছাড়া কাস্টমসের বিভিন্ন সমস্যা এড়াতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই মিটিং করা হয়। কীভাবে আরো ভালোভাবে কাস্টম হাউজের কাজ সম্পাদন করা যায় সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়। দৈনিক ভিত্তিতেও বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা হয়। এছাড়া এইচএস কোড না বুঝতে পারলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আমাদের কাছে আসতে বলি।’

তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের নতুন ছয়টা স্ক্যানার বসানো হচ্ছে। এ স্ক্যানারের সঙ্গে ওজন মাপার যন্ত্রও বসবে। তখন ওজন কম-বেশির জটিলতা কমে যাবে।’

ব্যবসায়ীদের সচেতনতার বিষয়ে এ উপকমিশনার বলেন, ‘তারা যখন ঘোষণা দেবে তা যেন যথাযথভাবে হয়। পণ্যের ওজন কী পরিমাণ তা যদি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে তাহলে ওজন নিয়ে সমস্যা হবে না। এছাড়া এইচএস কোড নিয়ে জটিলতার সম্মুখীন হলে আগে থেকেই কাস্টম হাউজে এসে জেনে নেবেন। ওজনের ক্ষেত্রে অনেক সময় মেশিনারিজ আমদানিতে অনিচ্ছাকৃত ভুলও হতে পারে ব্যবসায়ীদের।’