ইউরো অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ইউরো ব্যবহার করা দেশগুলোয় আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচক ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ১৯ দেশের অঞ্চলটিতে জুলাইয়ে এ হার ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে বিপর্যস্ত অবস্থায় ঠেলে দেয়া মূল্যস্ফীতির চাপ আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর থেকেই জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতার কারণে এ অঞ্চলের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। খবর রয়টার্স।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, আগস্টে পণ্যের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এ হার ১৯৯৭ সালে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। ক্রমবর্ধমান এ প্রবণতা ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংককে (ইসিবি) সুদের হার বাড়ানোর ধারা চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ তৈরি করেছে।

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর থেকে বিশ্বজুড়েই মূল্যস্ফীতির চাপ রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খাদ্য ও জ্বালানির দাম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়িয়ে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মুদ্রানীতি কঠোর করার পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও সেটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে। এর জেরে চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কভিডজনিত প্রতিবন্ধতার কারণে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। এরপর ইউক্রেনে যুদ্ধ দেশে দেশে মূল্যস্ফীতিকে ভয়াবহ উচ্চতায় ঠেলে দেয়। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে বিশ্ব প্রতিবাদ ও ধর্মঘটেরও মুখোমুখি হয়েছে। বিভিন্ন খাতের শ্রমিকরা জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় মোকাবেলায় মজুরি বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘট পালন করেন।

ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক ও নরওয়েতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গত সপ্তাহে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সতর্ক করেছে, বার্ষিক জ্বালানি বিল ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে ব্রিটিশরা। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতি চার দশকের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটি সুদের হার বাড়াতে ফেডারেল রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। জুলাইয়ে দেশটিতে পণ্যের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও এ হার জুনের ৯ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে কিছুটা কম।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, আগস্টে ইউরো অঞ্চলে জ্বালানির দাম ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে এ হার আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কম। এ সময়ে খাদ্যের দাম ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে সংস্থাটি। যদিও প্রাথমিক ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে।

আমস্টারডামভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান আইএনজি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্ট কলিজন একটি নোটে বলেন, ইউরোপের নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা এ অঞ্চলের মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে তুলছে। গ্যাস সরবরাহে সংকট এবং তীব্র খরা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে প্রভাব ফেলছে।

যুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন দেয়া দেশগুলোয় গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে রাশিয়া। ইউরো অঞ্চলে জ্বালানি নিয়ে চলমান এ অনিশ্চয়তা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল তীব্র খরার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দাবদাহের কারণে ভুট্টার মতো প্রধান ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে এবং খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

খাদ্য ও জ্বালানিতে রেকর্ড বাড়লেও অন্যান্য পণ্যে দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর রয়েছে। যেমন পোশাক, যন্ত্রপাতি, গাড়ি, কম্পিউটার ও বইয়ের মতো উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ। গত মাসে পরিষেবার খরচ বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া ডলারের বিপরীতে ইউরো মুদ্রার বিনিময় হারে পতনও দাম বাড়ার বড় একটি কারণ। ইউরোর অবমূল্যায়নে অঞ্চলটিকে আমদানিতে আরো বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে।