চলতি বছরের শেষ দিকে মন্দার কবলে পড়তে পারে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি। ক্রমবর্ধমান জ্বালানির ব্যয় এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের এক গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের মধ্য ভাগ নাগাদ যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনে ১ শতাংশ পতন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণায় গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছে, আগামী বছরের বার্ষিক উৎপাদনে দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচন হতে পারে, যা আগের পূর্বাভাস ১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে একেবারেই ভিন্ন।

অর্থনীতিবিদ জারি স্টেইন বলেন, যুক্তরাজ্যে জীবনযাপনের ওপর চাপ ক্রমে বাড়ছে। এ চাপকে আরো ঘনীভূত করেছে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট। ভোক্তা ব্যয় ছিল, তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

গত সপ্তাহে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে এশিয়া বা ইউরোপ, সব স্থানেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি। জ্বালানি সংকট, সুদের হার বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি এভাবে চলতে থাকলে গোটা বিশ্বই মন্দার কবলে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ২৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাড়ায় সুদের হার। সে সময় সতর্ক করে বলা হয়, যুক্তরাজ্য মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ধারণা হলো, শিগগিরই পরিবারগুলোর সঞ্চয়ের পরিমাণ স্থিতাবস্থার নিচে নেমে যাবে। সাধারণ মানুষের আয় কমার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা ব্যয় সাধারণ সময়ের চেয়ে ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মন্দা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের বাড়তি দাম আরো অনেক দিন বহাল থাকবে। ফলে পরিবারগুলোকে জীবনযাপনের জন্য সঞ্চিত অর্থে হাত দিতে হবে। পরিবারের খরচ চালাতে বাড়তি অর্থ যুক্ত করতে হবে। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি আগামী বছর ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হারে সংকুচিত হতে পারে।

করোনা মহামারী শুরুর ধাক্কার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোয় সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি। দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বাছাই নিয়ে রক্ষণশীল দল যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন সাধারণ মানুষও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা।

ব্লুমবার্গ নিউজ পরিচালিত এক দল অর্থনীতিবিদের প্রাক্কলনে দেখা গেছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। করোনা মহামারী থেকে চলতি বছরে দেশটির অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন অন্যান্য প্রথম সারির অর্থনীতির মতো যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।

ব্রিটিশ ডাক বিভাগের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিসে ৩৩২ কোটি পাউন্ড নগদ অর্থ সঞ্চয় হয়েছে। জুনের চেয়ে তা ১০ কোটি পাউন্ড বেড়েছে। জুলাইয়ে ৮০ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড নগদ অর্থ তুলেছেন সঞ্চয়কারীরা। ২০২১ সালের একই মাসের চেয়ে যা ২০ শতাংশ বেড়েছে এবং মাসওয়ারি বেড়েছে ৮ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এ উপাত্ত রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ অর্থ তোলা হয়েছে বলে জানায় ব্রিটিশ ডাক বিভাগ। ৪০ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। জীবনমানের ব্যয় বৃদ্ধিতে এবং আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সঞ্চয় ভেঙে জরুরি প্রয়োজন মেটাচ্ছে ব্রিটিশ নাগরিকরা। প্রাত্যহিক জীবনযাপনে ব্রিটিশ নাগরিকরা যখন হিমশিম খাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন তা নিয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে চলছে আরেক লড়াই। ৪০ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার কৌশল নিয়ে তর্কে জড়াচ্ছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস ও সাবেক অর্থমন্ত্রী রিশি সুনাক।

ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের দাবি তুলেছেন অনেকে। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওই) সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ চার্লি বিন। বরিস জনসনের সরকার চলতি বছরের শুরুতে যে সহায়তা প্যাকেজ দিয়েছে তা যথেষ্ট মনে করছেন না তারা। চলতি মাসের শুরুতে ব্রিটিশ সংবাদপত্র অবজারভারে লেখা এক মতামতে জরুরি বাজেট প্রণয়নের পরামর্শও দিচ্ছেন গর্ডন ব্রাউন। বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ায় অনেক পরিবার জ্বালানি দারিদ্র্যে পড়বে বলে আশঙ্কা সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ট্রাস ও সুনাকের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কীভাবে ব্রিটিশ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তা নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছেন এ দুই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী।