কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছে জাপান। চীনে লকডাউন শিথিলের পর স্বাভাবিক হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমছে যন্ত্রাংশের ঘাটতিও। এ অবস্থায় গতি ফিরেছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমে। জুনে জাপানের কারখানাগুলোয় নয় বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম গতিতে উৎপাদন বেড়েছে। যেখানে মাসভিত্তিক হিসাবে মে মাসে উৎপাদন ৭ দশমিক ৫ শতাংশের বড় সংকোচনে পড়েছিল। সে তুলনায় গত মাসে ভালো করায় অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত হবে বলে আশা নীতিনির্ধারকদের।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে জাপানের শিল্পোৎপাদন আগের মাসের তুলনায় রেকর্ড ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এটি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়ার পর থেকে এক মাসে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। মূলত সাংহাইয়ে কভিডজনিত লকডাউন তুলে নেয়ার কারণে গাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং ডিভাইসের উৎপাদন ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছে।

পৃথক তথ্যে দেখা যায়, গত মাসে জাপানের খুচরা বিক্রি টানা চতুর্থ মাসে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সংকোচনের পর ক্রমবর্ধমান ভোক্তা ব্যয় দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে সহায়তা করেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ জাপানি অর্থনীতিবিদ মার্সেল থিলিয়ান্ট বলেন, জুনে গাড়ি উৎপাদন আগের মাসের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। কারণ সাংহাইয়ে লকডাউন শিথিলের পর যন্ত্রাংশ ঘাটতি হ্রাস পেয়েছে।

গত মাসে শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমের গতি অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে যন্ত্রাংশ সরবরাহ বিলম্বের কারণে উৎপাদনে পুনরায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। টয়োটা জানিয়েছে, জুনে বিশ্বজুড়ে সংস্থাটি ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭৮ ইউনিট গাড়ি উৎপাদন করেছে। দুবার কমানোর পর সর্বশেষ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি গাড়ি উৎপাদন করেছে সংস্থাটি। চীনে লকডাউনের কারণে সৃষ্ট চিপসহ যন্ত্রাংশ ঘাটতি ও অন্যান্য বাধার কারণে বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।

শিনকিন সেন্ট্রাল ব্যাংক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তাকুমি সুনোদা বলেন, বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি এবং বিশেষ করে উৎপাদন খাত স্পষ্টভাবে ধীর হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি জাপানি শিল্পোৎপাদন কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরুদ্ধারের গতি আরো দ্রুত হতে পারত।

সরকার শিল্পোৎপাদনের মূল্যায়ন হালনাগাদ করে জানিয়েছে, খাতটি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমইটিআই) বিভাগের সমীক্ষায় নির্মাতারা আশা করছেন, চলতি মাসে শিল্পোৎপাদন ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আগস্টে ৬ শতাংশ হারে বাড়বে।

পৃথক তথ্যে দেখা যায়, গত মাসে জাপানের খুচরা বিক্রি ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও তা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল ছিল। জুনে খুচরা বিক্রি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে রয়টার্সের জরিপে ২ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এ তথ্য তুলে ধরে যে, অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি অবদান রাখা ভোক্তা ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি দ্বিতীয় প্রান্তিকে মন্থর রয়ে গিয়েছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সাম্প্রতিক কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি আসন্ন মাসগুলোয় পারিবারিক ব্যয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চলতি মাসে টোকিওর কোর ভোক্তা মূল্য সূচক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এটি টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ব্যাংক অব জাপানের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থনীতিবিদ তাকুমি সুনোদা বলেন, গ্রীষ্মের মাসগুলোয় দাম বাড়তে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। আর এটি ভোক্তা মনোভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।