এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উড়োজাহাজ ভ্রমণে বিশৃঙ্খলা চলছে। চলমান গ্রীষ্ম মৌসুমের ছুটিতে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্ব নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ বিশৃঙ্খলার কারণ হিসেবে কর্মিস্বল্পতাকে দায়ী করে আসছে এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দরগুলো। এমন পরিস্থিতি এড়াতে ভ্রমণের জন্য বক্তিগত জেট বেছে নিচ্ছেন ইউরোপীয় অতিধনীরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক মাসে ব্যক্তিগত জেটের ব্যবহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।
ইউরোপিয়ান বিজনেস এভিয়েশন অ্যাসোসিয়েশন ডাটা অনুসারে, লন্ডন সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত ফ্লাইটের রেকর্ড করেছে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের রাজধানীর বিমানবন্দরগুলো ১ হাজার ২০০টিরও বেশি ব্যক্তিগত ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। এছাড়া ইতালির নেপলস, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও জার্মানির বার্লিনের বিমানবন্দরগুলোয় ২০১৯ সালের তুলনায় ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ফ্লাইট সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
কভিডজনিত বিধিনিষেধ তুলে দেয়ার পর থেকেই মহামারীতে ছাঁটাই করা কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপীয় এভিয়েশন খাত। কঠোর শ্রমবাজারের পরিস্থিতির কারণে এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দরগুলো দ্রুত কর্মিবাহিনী প্রসারিত করতেও পারছে না। কর্মী ঘাটতির কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ডয়চে লুফথানসা ও অন্য প্রধান উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলো চলতি গ্রীষ্মে কয়েক হাজার আন্তঃইউরোপীয় ফ্লাইট বাতিল করেছে।
এভিয়েশন খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উইংএক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড কোয়ে বলেন, ইউরোপে ব্যক্তিগত ফ্লাইটে ভ্রমণ করা মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৪০ শতাংশের মতো বেড়েছে। বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় প্রধান নির্বাহী ভ্রমণ প্রতিবন্ধকতা এড়াতে ব্যক্তিগত ফ্লাইটকে বেছে নিয়েছেন।
ইউরোপে ভ্রমণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে উত্তর আমেরিকা থেকে। দ্রুত বৃদ্ধির কারণে ফ্রান্সে ব্যক্তিগত জেটের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে। কারণ দেশটি জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চেষ্টা করে যাবে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাত্কারে ফরাসি পরিবহনমন্ত্রী ক্লেমেন্ট বোন বলেন, ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ফ্লাইট বিবরণ আমরা প্রকাশ্যে আনতে চাই। পাশাপাশি রেল বা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের বিকল্প থাকলে ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারে নির্দেশিকা সেট করা হবে।
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সংকটের সময়ে ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের উল্লম্ফন বিভক্ত অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরছে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার মান রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে চলে গিয়েছে। অথচ এমন সময়েও অতিধনীরা বিলাসী ফ্লাইটে চলাচল করা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
গত মাসে লন্ডনে ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ফ্লাইট বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। যখন প্যারিসে এ বাড়ার হার ৪৩ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এ সময়ে ইউরোপে ১ লাখ ৭৯ হাজার ব্যক্তিগত জেটের ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। এ সংখ্যা প্রাক-কভিডস্তরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ইউক্রেনে সংঘাত ও কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল কমে গেলেও ব্যক্তিগত জেটের ফ্লাইট সংখ্যায় এমন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাইয়ে মস্কো মাত্র ৩৫৪টি ব্যক্তিগত জেট ফ্লাইট রেকর্ড করেছে। এ সংখ্যা তিন বছর আগের ১ হাজার ৮২ থেকে অনেক কম। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত এভিয়েশন খাতের ব্যাঘাতও ভূমিকা রেখেছে। যেমন চীনে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাতের কারণে রক্ষণাবেক্ষণ বিলম্ব তৈরি হয়ে অনেক জেট ফ্লাইট পরিচালনায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ইউরোপের ব্যক্তিগত জেট পরিচালনাকারীদের একটি নেটওয়ার্ক অ্যারোঅ্যাফেয়ার্সের বিক্রয় বিভাগের প্রধান ইসাবেল ক্লার্ক বলেন, এর আগে মানুষরা ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া করতে ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা আগে ফোন করত। তবে চলতি বছর এ পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। যদি এক সপ্তাহ আগে বুকিং না করেন, তবে আপনি কখনই জেট পাবেন না।
এদিকে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ভ্রমণের ব্যয়ও বেড়েছে। যদিও ব্যয় বাড়ার ক্ষেত্রে জেট ফুয়েলের দামও ভূমিকা রেখেছে। গত এক বছরে জেট ফুয়েলের দাম ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। প্যারিস থেকে গ্রিসের মিকোনাস দ্বীপে ভ্রমণ করতে এখন ২৫ হাজার ইউরো খরচ হয়। এক বছর আগের তুলনায় এ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ।









