মহারাষ্ট্রের পালঘর হাইওয়েতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলেন সাইরাস মিস্ত্রি। রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে একটি ডিভাইডারের সঙ্গে ধাক্কা খায় তার মার্সিডিজ। এতে সর্বমহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কিন্তু কে এ সাইরাস মিস্ত্রি?
সাইরাস পালোনজি মিস্ত্রি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৮ সালে। মহারাষ্ট্রের পারসিক পরিবারে। পূর্বপুরুষরা বহু বছর আগে থেকেই ইরান থেকে ভারতে এসে স্থায়ী হন। তখন থেকেই এখানকার ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছে ধর্মের দিক থেকে জরাথুস্ত্রবাদী পারসিকরা। সাইরাসের পিতা পালোনজি মিস্ত্রি ছিলেন বিখ্যাত বিলিয়নেয়ার এবং বিজনেস আইকন। ছিলেন সাপোরজি পালোনজি গ্রুপের চেয়ারম্যান। চলতি বছরের জুনেই ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ছোট ছেলে হিসেবেই সাইরাস বেড়ে ওঠেন শিল্পপতি পিতা এবং আইরিশ মা প্যাটসি পেরিন ডাবাসের ঘরে।
মিস্ত্রি পরিবার এশিয়ার ১৬তম সম্পদশালী পরিবার। ১৮৬৫ সালে পালোনজি মিস্ত্রি প্রতিষ্ঠা করেন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান লিটলউড পালোনজি অ্যান্ড কোং। ১৮৮১ সালে মুম্বাইয়ে নাগরিকদের পানি সরবরাহের জন্য জলাধার নির্মাণ করে এ প্রতিষ্ঠান সুনাম অর্জন করে। পালোনজির ছেলে সাপোরজি পারিবারিক ব্যবসা ধরে রাখার কারণেই পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তিনিই প্রথম যুক্ত হন টাটা সন্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। দাদার নামে নাম মিস্ত্রি পরিবারে তৃতীয় প্রজন্ম পালোনজি মিস্ত্রি। তিনিই সাইরাস মিস্ত্রির পিতা। এই পালোনজি ভারত শুধু নয়; উপসাগরীয় দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। ওমান সুলতানের প্রাসাদ তার প্রতিষ্ঠানেরই কীর্তি। তার নিষ্ঠা আর প্রচেষ্টায় সম্পদ বেড়ে ওঠে কয়েক গুণ। ২০১২ সালে তিনি পুত্র সাপোরের কাছে দায়িত্ব দেন। সরিয়ে নেন নিজেকে।
সাইরাস লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে পড়াশোনা করেন। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর করেন ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালেই সাপোরজি পালোনজি অ্যান্ড কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। বয়সে তরুণ এবং মিষ্টভাষী হওয়ার কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যেই তিনি কোম্পানিতে পরিবর্তন নিয়ে আসেন। আনেন বৈচিত্র্যও। তার যোগ্যতার মধ্য দিয়েই পরবর্তী সময়ে আবির্ভূত হন টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে। ২০১৩ সালে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন তাকে ভারত ও ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপতিদের তালিকায় স্থান দেয়।
সাইরাস মিস্ত্রি টাটা গ্রুপের ষষ্ঠ চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১২ সাল থেকে চার বছরের জন্য। অবশ্য টাটা সন্সে তার আগমন ২০০৬ সালের দিকে। তারও আগে ছিলেন টাটা পাওয়ার কোম্পানিতে। টাটার বড় কোম্পানিগুলো তিনিই পরিচালনা করতেন সে সময়, বিশেষ করে টাটা স্টিল, টাটা মোটরস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিস, টাটা পাওয়ার, টাটা কেমিক্যালস ও টাটা গ্লোবাল বেভারেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমান টাটা মোটরসের এ প্রভাবের পেছনে রয়েছে সাইরাস মিস্ত্রির দূরদর্শিতা ও বিভিন্ন পদক্ষেপ। কিন্তু তার কিছু সিদ্ধান্ত সমালোচিতও হয় বেশ। ২০১৬ সালে বোর্ড তার প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে এবং তাকে ওই পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এ টানাপড়েন গিয়ে পৌঁছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল আপিলেট ট্রাইব্যুনালে (এনসিএলএটি)। ২০১৮ সালে এনসিএলএটি সিদ্ধান্ত দেয় সাইরাসের বিরুদ্ধে। প্রতিক্রিয়ায় আপিল করেন সাইরাস। যদিও ২০১৯ সালেই রায় তার পক্ষে আসে। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তেই পুনরায় চেয়ারম্যান হন সাইরাস।
টাটা সন্স প্রতিষ্ঠানের ১৮ দশমিক ৪ শতাংশই তার কোম্পানি সাইরাস ইনভেস্টমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স অনুসারে তার সম্পদ ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা তাকে ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালীদের একজনে পরিণত করেছে। ভারতের বিশেষ রাজনীতিবিদ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন কাউন্সিলের (এনআইসি) অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।









