কভিড-১৯ মহামারীর সংক্রমণ রোধে ভারতজুড়ে লকডাউন চলছে। প্রায় সব আর্থিক ও শিল্প খাতের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। বাদ পড়েনি চা বাগানগুলোও। এতে দেশটির চা শিল্প বিরাট আকারের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আসামের ক্ষতি রেকর্ড ছাড়াতে পারে। স্থানীয় চা উৎপাদনকারীদের একটি সংস্থা প্রাক্কলন করেছে, লকডাউনের জেরে আসামের চা শিল্পের আর্থিক ক্ষতি ছুঁতে পারে ১ হাজার ২১৮ রুপি। খবর দ্য হিন্দু ও ইকোনমিক টাইমস।

টি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার মাসভিত্তিক ফসল উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে এ প্রাক্কলনটি দিয়েছে আসামে অবস্থিত নর্থ ইস্টার্ন টি অ্যাসোসিয়েশন (এনইটিএ)। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির চলমান লকডাউন যদি ৩ মের পরও বজায় থাকে, তবে আসামের চা শিল্পের আর্থিক ক্ষতি আরো বাড়তে পারে। 

লকডাউনের মধ্যে চা বাগানগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ সময়মতো চা পাতা সংগ্রহ করতে না পারা। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়, যা লকডাউনে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পাতাগুলো অতিবাদামি হয়ে সংগ্রহের অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিকে ফিরলে বাগান মালিকদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে এ বয়স্ক পাতা ছাঁটাই করা এবং এতে তিন সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যেতে পারে। এরপর সতেজ চা পাতা তোলা সম্ভব হতে পারে।

এনইটিএর পরামর্শক বিদ্যানন্দ বলেন, বর্তমানে চা শিল্পের সব ধরনের কর্মকাণ্ড স্থগিত রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে ৫০ শতাংশ কর্মশক্তি নিয়ে শিগগিরই সীমিত পরিসরে চা বাগানগুলো কার্যক্রমে ফিরতে পারে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার এরই মধ্যে হয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, আসামের চা বাগানগুলোর কার্যক্রম নির্ধারণ হয় মৌসুমি প্রকৃতি চক্রের ওপর ভিত্তি করে। গত ২২ মার্চ থেকে আসামের চা বাগানগুলো লকডাউনের আওতায় আছে। এ সময় মৌসুমের একটি ফসল শেষ হয়ে নতুন পর্যায়ে পদার্পণের সময় হয়। মার্চের শেষের দিকের এ লকডাউন পুরো মাসের ফসলের ক্ষতি করেছে। যার প্রাক্কলন ধরা হয়েছে তিন কোটি কেজির মতো।

টি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে আসামের মোট বার্ষিক চা উৎপাদনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ সংগ্রহ করা হয়েছিল মার্চে। পরিমাণে যা ছিল প্রায় ৭১ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার কেজি। এছাড়া এপ্রিল ও মে মাস রাজ্যটির চা শিল্পের জন্য সবচেয়ে উৎপাদনশীল মাস। এ সময়ে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানও হয় সেরা। গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসে রাজ্যটির পুরো বছরের মোট উৎপাদনের যথাক্রমে ৬ দশমিক ৩ ও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ চা সংগ্রহ করা হয়েছিল। 

বিদ্যানন্দ বলেন, দীর্ঘায়িত লকডাউনের কারণে চা বাগানগুলোর অতিবাদামি হয়ে যাওয়া প্রায় ৩৫ শতাংশ পাতা ছেঁটে ফেলতে হবে। এতে এপ্রিলে তিন কোটি কেজি ও মে মাসে আরো ২ কোটি কেজি ফসলের ক্ষতি হতে পারে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ফসলের মোট লোকসান দাঁড়াতে পারে ৮ কোটি কেজিতে।

২০১৯ সালে উত্তর ভারতের (আসামসহ) নিলামগুলোতে চায়ের গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ১৫২ দশমিক ২৬ রুপি। এ হিসেবে এনইটিএ ধারণা করছে, চলতি লকডাউনের কারণে আসামের চা শিল্পের আর্থিক ক্ষতি দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ২১৮ কোটি রুপি।

এ পরিস্থিতিতে চা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা গভীর সংকটে পড়েছেন। ভারতের টি বোর্ডের আসাম শাখা ও আসাম টি প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এ অঞ্চলের চা বাগানগুলো ১৯৭ বছরের পুরনো। এ দীর্ঘ সময়ে অন্যান্য শিল্পের মতো আর্থিক সংকটে পড়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কোনো ঐতিহ্য নেই তাদের। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা দিশেহারা। আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সরকারের কাছে যথাযথ পদক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন আসামের চা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। 

উল্লেখ্য, বার্ষিক হিসাবে ভারতে উৎপাদিত মোট চায়ের ৫০ শতাংশের মতো উৎপাদন হয় শুধু আসামে। গত বছর দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যটিতে মোট ১৩৯ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল।