অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে সোমবার বিকালে একটি কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দিন শেষের বেচাকেনায় জ্বালানি পণ্যটির দাম ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। কমতে কমতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম শূন্য ডলারের অনেক নিচে নেমে যায়। বিক্রেতারা এ দামকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় ‘মাইনাস প্রাইসিং’ কিংবা ‘ডিসকাউন্ট প্রাইস’ বলছেন। তবে সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এ সময় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আদতে বিনা মূল্যে দেয়া হলেও ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। জ্বালানি পণ্যটির বাজারে এ চিত্র আগে কখনই দেখা যায়নি। তবে গতকাল মাইনাস প্রাইস থেকে ধনাত্মক ধারায় উঠেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। তবে তা এখনো ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মন্দার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত বলছেন বিশ্লেষকরা।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন থাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। এর বিপরীতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন ও পরিশোধন কমায়নি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সংরক্ষণাগারগুলো পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল মজুদ করার মতো আর কোনো সংরক্ষণাগার খালি নেই। এ খবরে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। বিশেষত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) বাজার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সোমবার দিন শেষের বেচেকেনায় জ্বালানি পণ্যটির দাম শূন্য ডলারের নিচে নেমে যায়। এ সময় মে মাসে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়ায় মাইনাস ৩৭ ডলার ৯৬ সেন্টে।

জ্বালানি তেলের এ ‘ডিসকাউন্ট মূল্য’ স্তব্ধ করে দেয় ক্রেতা-বিক্রেতাসহ খাতসংশ্লিষ্টদের। বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে বসেন বিশ্লেষকরা। তবে এ ডিসকাউন্ট মূল্য থেকে গতকাল জ্বালানি তেলের দাম সামান্য বেড়েছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মে মাসে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম আগের দিনের তুলনায় ৩১ ডলার ৩৩ সেন্ট বেড়ে মাইনাস ৬ ডলার ৩০ সেন্টে উন্নীত হয়েছে। অথচ সোমবার সকালেও প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল। অন্যদিকে এদিন জুনে সরবরাহ চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ২১ ডলার ৭৩ সেন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৫ দশমিক শূণ্য ২ শতাংশ কম।

এ বিষয়ে নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ওনাডা করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মওয়া বলেন, জ্বালানি তেলের এ দরপতন নজিরবিহীন। আগে কখনই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া এবং সংরক্ষণাগারগুলোর সক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যাওয়া এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকেই জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি আরো নিম্নমুখী হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১০ এপ্রিল অবধি যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল সংরক্ষণাগারগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার ৭২ শতাংশ পূরণ হয়ে গেছে। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে দিয়েছিল, দ্রুত ব্যবহার বাড়ানো না গেলে কিংবা উত্তোলন না কমালে শিগগিরই সংরক্ষণাগারের সক্ষমতা পূরণ হয়ে যাবে। তখন আর নতুন করে জ্বালানি তেল মজুদের সুযোগ থাকবে না। আদতে সেটাই হয়েছে।

এ বিষয়ে নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রোকারেজ গ্রুপ মিজুহোর পরিচালক বব ইয়াওগার বলেন, সংরক্ষণ সুবিধা পূর্ণ থাকায় ক্রেতারা বাজারমুখী হননি। এ কারণে বাজারে স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই জ্বালানি তেলের দাম কমে গেছে। এমনকি মূল্যছাড় দেয়ার পরও বাজারে ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। জ্বালানি তেলের বাজারে এটা সম্পূর্ণ নতুন একটি অভিজ্ঞতা।

ডব্লিউটিআইয়ের দাম ‘মাইনাস ডলার’ থেকে গতকাল ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই। তাই বলে কি বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পথে রয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকরা না সূচক কথা বলছেন। বব ইয়াওগার বলেন, জ্বালানি তেলের বাজারে বিদ্যমান মন্দা ভাব বজায় থাকবে দীর্ঘদিন। কেননা লকডাউন উঠে গিয়ে অর্থনীতি গতিশীল হতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। তার আগে জ্বালানি তেলের চাহিদা খুব একটা বাড়বে না। ফলে সংরক্ষণাগারগুলোও সহসা খালি হচ্ছে না।

একই কথা বলছেন এডওয়ার্ড মওয়াও। তিনি বলেন, যতদিন সংরক্ষণাগারে জ্বালানি তেলের মজুদ থাকবে, ততদিন ক্রেতারা বাজারমুখী হবেন না। এতে বেচাকেনাও খুব একটা বাড়বে না। তাই এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজার চাঙ্গা করতে দ্রুত লকডাউন তুলে নেয়া এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরানো জরুরি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে সেটা সহসাই হচ্ছে না।

চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমানোর ওপর জের দেন সিডনিভিত্তিক সিএমসি মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ মিখায়েল ম্যাকার্থি। তিনি বলেন, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষাণাগারগুলো এখনই খালি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন কমিয়ে আনার বিকল্প নেই।

মার্চের শুরুতে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যকার মূল্যযুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দেয়। ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে দাম। তখন থেকেই বাজার ভারসাম্য ফেরাতে তত্পর হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে জ্বালানি পণ্যটির সম্মিলিত উত্তোলন কমিয়ে আনতে সম্মত হয় সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ ওপেক-নন ওপেক দেশগুলো। নজিরবিহীন এক চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগামী ১ মে থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সম্মিলিত উত্তোলন দৈনিক ৯৭ লাখ ব্যারেল কমাতে রাজি হয়। ওপেকের ইতিহাসে আগে কখনই এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানো হয়নি।

মিখায়েল ম্যাকার্থি বলেন, নিজেদের সংরক্ষণাগারগুলোর সক্ষমতা নিয়ে আগে থেকেই সচেতন ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে সময় থাকতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ওপেক-নন ওপেক দেশগুলোকে জ্বালানি তেল উত্তোলন কমাতে রাজি করিয়েছেন। এমনকি চুক্তির শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্রও জ্বালানি তেল উত্তোলন কমাবে বলে জানিয়েছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। উত্তোলন কমিয়ে আনার আগেই ডব্লিউটিআইয়ের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে চলে গেছে।

রয়টার্স, ব্লুমবার্গ ও অয়েলপ্রাইসডটকম অবলম্বনে