কভিড-১৯ রোগের সংক্রমণ রোধে ভারতে প্রথমে ২১ দিনের লকডাউন চালু হয়। পরে তা বাড়িয়ে ৪০ দিন করা হয়। এ পরিস্থিতিতে জরুরি সেবা ব্যতীত দেশটির প্রায় সব ধরনের আর্থিক ও শিল্প খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে অন্যান্য শিল্পের মতো দেশটির প্রাকৃতিক রাবার শিল্পের লোকসানের বোঝাও দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন বাগানের ৬১০ কোটি রুপি সমমূল্যের ৪৯ হাজার টন রাবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোর চা, কফি, রাবার, এলাচ ও গোলমরিচ উৎপাদকদের শীর্ষ সংগঠন ইউনাইটেড প্লান্টারস অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইন্ডিয়া (ইউপিএএসআই) এ তথ্য জানিয়েছে। খবর দ্য হিন্দু ও ইকোনমিক টাইমস।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপের আগে থেকেই ভারতের রাবার খাত নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বর্তমানে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক রাবারের তুলনায় অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানি করা তুলনামূলক সস্তা রাবারের সরবরাহ বেশি থাকায় ২০১১ সালের পর থেকে পণ্যটির দামে নিম্নমুখী প্রবণতা বাজায় রয়েছে। তার ওপর বতর্মানে মাহামারীর সংক্রমণ রোধে লাকডাউনের জেরে দেশটির রাবারের বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে শিট ও ন্যাটেক্স-জাতীয় রাবার পণ্যের বিক্রি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এ শিল্পে নগদ অর্থের প্রবাহ যেমন কমেছে, তেমনি মুনাফা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইউপিএএসআইয়ের সভাপতি আরএম নাগাপ্পান বলেন, সামনের দিনগুলো ভারতের প্রাকৃতিক রাবার শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। মহামারীর কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অপ্রত্যাশিতভাবে কমছে, যা অন্যান্য খাতের মতো রাবার খাতেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তিনি পণ্যটির শীর্ষ উৎপাদনাকরী দেশগুলোর জোট অ্যাসোসিয়েশন অব ন্যাচারাল রাবার প্রডিউসিং কান্ট্রিজের (এএনআরপিসি) উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ১ কোটি ৪১ লাখ ১০ হাজার টন রাবার উৎপাদন হতে পারে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ কম। এর পেছনে কভিড-১৯-এর প্রকোপে পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। চাহিদা কমায় পণ্যটির মূল্য হ্রাস এ শিল্পের লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে জানান তিনি।
এরই মধ্যে রাবারের বৈশ্বিক চাহিদা ব্যাপক হারে কমেছে। এএনআরপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। মূলত চীনে পণ্যটির চাহিদা হ্রাস এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে। চীন বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক রাবার ব্যবহারকারী দেশ। গোটা বিশ্বের মোট ব্যবহারের ৪০ শতাংশই ব্যবহার হয়ে থাকে চীনে। চীনের গণ্ডি পেরিয়ে নভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হলে ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বিশ্বেও বিভিন্ন দেশ জরুরি অবস্থা জারি করে। এতে দেশে দেশে প্রায় সব ধরনের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রাবারের ব্যবহার নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতি পণ্যটির দামে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানের এ সংকটপূর্ণ অবস্থার মধ্যে অভ্যন্তরীণ রাবার শিল্প রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্যটির আমদানি বন্ধের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানিয়েছে ইউপিএএসআই। এ বিষয়ে সরকারের সহয়তাও প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। সল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে এক বছরের জন্য পণ্যটির আমদানি বন্ধের আদেশের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথবা অভ্যন্তরীণ বাজারে বর্তমানে যে পরিমাণ মজুদ দাঁড়িয়েছে, তা থেকে অন্তত ৩ লাখ ১০ হাজার টন শেষ হওয়া পর্যন্ত পণ্যটির আমদানি স্থগিত রাখলে দেশীয় খাতটি অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে তারা।
আরএম নাগাপ্পান বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতে রাবার সংগ্রহের মূল মৌসুম বিরাজ করে। এ সময়ে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত পণ্যের প্রচুর সরবরাহ থাকে। তাই এ সময়ে পণ্যটির আমদানি বন্ধ করে দিলে অভ্যন্তরীণ বাজারের লোকসান অনেকটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।









