ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর এক বছরে আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের বাজারে রাশিয়ার বাণিজ্য লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। দেশটির ঊর্ধ্বমুখী গম ও সূর্যমুখী তেল রফতানির কারণে পিছিয়ে পড়েছে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক প্রবাহ। বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনটা জানিয়েছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস।
গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাস ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলো অবরুদ্ধ ছিল। ফলে ২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমে (জুলাই-জুন) দেশটির গম রফতানি আগের বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। সূর্যমুখী তেল রফতানি কমে নেমেছে পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে।
বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর দিয়ে শস্য রফতানির গতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ ও তুরস্ক। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে আবরো চালু হয় রফতানি। কিন্তু এরপর বাণিজ্য প্রবাহে বড় রদবদল দেখা দেয়। এশিয়ার দেশগুলোয় ইউক্রেনের রফতানি কমে আসে। এর পরিবর্তে ইউরোপের বাজারে স্থলপথে সূর্যমুখী তেলবীজ, গম ও ভুট্টা রফতানি বাড়ায় দেশটি।
রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ খাদ্যশস্য সরবরাহকারী দেশ। বৈশ্বিক গম রফতানিতে দেশ দুটির অবদান ২৭ শতাংশ, ভুট্টা রফতানিতে ১৫ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেল রফতানিতে ৭৪ শতাংশ। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রবাহে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়।
২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমের এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের গম রফতানি গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে রাশিয়ার রফতানি শুল্ক বৃদ্ধিকে দায়ী করছে ইউক্রেনের কৃষি মন্ত্রণালয়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষণ বলছে, চলতি মৌসুমে ইউক্রেনের গম রফতানি দাঁড়াবে ১ কোটি ৩৮ লাখ টনে, যা আগের মৌসুমের তুলনায় ২৭ শতাংশ কম। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে প্রায় কয়েক সপ্তাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশটির গম রফতানি। তবে জুলাইয়ে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রফতানি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।
ইউক্রেনের কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির গম রফতানির রুটে বড় রদবদল হয়েছে। ফলে ইউরোপে সরবরাহ প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। বিপরীতে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোয় ৭৫-৮০ শতাংশ কমেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মৌসুমে ইউক্রেনের গম রফতানি কমে ১ কোটি ২০ লাখ টনে নামতে পারে।
রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক। চলতি মৌসুমে দেশটি রফতানিতে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত বছরের ১ জুন থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়া ২ কোটি ৪৯ লাখ টন গম রফতানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ লাখ টন বেশি।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বলছে, চলতি মৌসুমে রাশিয়ার মোট গম রফতানি দাঁড়াবে ৪ কোটি ১৫ লাখ টনে। এর আগের মৌসুমে দেশটি রফতানি করেছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ টন।
২০২২-২৩ মৌসুমে ইউক্রেন শস্যটির উৎপাদন কমে ২ কোটি ১০ লাখ টনে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল। এর আগের মৌসুমে দেশটিতে ৩ কোটি ৩০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছিল। রুশ ক্ষেপণান্ত্রের আঘাতে দেশটির বেশির ভাগ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে কৃষি উপকরণ ও অবকাঠামো। ফলে আগামী মৌসুমে উৎপাদন আরো কমে ১ কোটি ৬৮ লাখ টনে নামার আভাস দিয়েছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
অন্যদিকে রাশিয়ায় উৎপাদন ৯ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছার পূর্বাভাস মিলেছে। আগের মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৭ কোটি ৫২ লাখ টন। আগামী মৌসুমে দেশটিতে উৎপান কিছুটা কমে ৮ কোটি ৪৬ লাখ টনে নামতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউক্রেন ফ্রি অন বোর্ড চুক্তিতে প্রতি টন গম ২৭৪ ডলারে রফতানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম কমেছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে রাশিয়া প্রতি টন গম বিক্রি করেছে ২৯৮ ডলার মূল্যে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ ভুট্টা রফতানিকারক। মার্কিন কৃষি বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশটির ভুট্টা রফতানি ২ কোটি ২৫ লাখ টনে নামতে পারে। যুদ্ধপূর্ব রফতানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬৯ লাখ ৮০ হাজার টন।
চলতি মৌসুমের এখন পর্যন্ত ইউক্রেন ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার টন ভুট্টা রফতানি করেছে। গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে ৭ শতাংশ। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ান আগ্রাসন মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে ইউক্রেন দেশীয় পণ্যের ওপর থেকে আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে গত এক বছরজুড়ে দেশটির ভুট্টা রফতানি লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। ২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেন থেকে ৭৮ লাখ ৯০ হাজার টন খাদ্যশস্য আমদানি করেছে। গত মৌসুমের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৪৯ লাখ টন।
শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে ২৩ ফেব্রুয়ারি মার্চে সরবরাহের জন্য প্রতি বুশেল ভুট্টার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ ডলার ৭৫ সেন্টে। চলতি মাসজুড়ে শস্যটির দাম ছিল নিম্নমুখী। অন্যদিকে কৃষ্ণসাগরীয় ভুট্টার রফতানি মূল্যও কমেছে। ফ্রি অন বোর্ড চুক্তিতে প্রতি টন রফতানি হচ্ছে ২৫৩ ডলারে।
চলতি মৌসুমে ইউক্রেনের সূর্যমুখী তেল রফতানি কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের ফরেন এগ্রিকালচার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, এ মৌসুমে রফতানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টনে। ইউক্রেনের রফতানি কমে যাওয়ায় বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক দেশ ভারত আর্জেন্টিনা থেকে পণ্যটির ক্রয় বাড়িয়েছে।









