হিসাব পেশার পরিসর এখন আর কেবল হিসাবরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঝুঁকি মডেলিং, মূল্যায়ন, নিরীক্ষা, অনুসন্ধান এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তবে মূল্যায়ন ও নিরীক্ষার মানে পক্ষপাত এলে জনআস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টেকসই প্রতিবেদন ও নৈতিক এআই ভবিষ্যৎ পেশাগত অনুশীলনের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেয়া উচিত বলে মত দেন তারা।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত দক্ষিণ এশিয়ার সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদদের (সাফা) নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বক্তারা। ‘পরবর্তী প্রজন্মের পেশা: নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই প্রতিবেদন একীভূতকরণ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশের হিসাববিদদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। সাফা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদদের আঞ্চলিক সংগঠন সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অন অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সংক্ষিপ্ত রূপ। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এএইচএম আহসান, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।

উপস্থিত ছিলেন আইসিএবির সভাপতি এনকেএ মোবিন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান ও আইসিএবির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টসের (আইএফএসি) সভাপতি জ্যঁ বুকো, সাফার উপদেষ্টা আশফাক ইউসুফ তোলা। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি রহমান রহমান হক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সিনিয়র পার্টনার আদীব হোসেন খান।

সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির প্রভাবে সাফার কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। আশির দশকের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমি যখন কর্মজীবন শুরু করি, তখন এ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা তৈরির প্রাথমিক কাজগুলোতে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। তবে দুঃখের বিষয় হলো রাজনীতির প্রভাবে সংস্থাটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতে আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।’

আগামী প্রজন্মের পেশাদারদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং টেকসই প্রতিবেদন তৈরির সমন্বয় বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা হিসাববিজ্ঞানসহ সব পেশাকে বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আমাদের পেশাদারদের শুধু কারিগরিভাবে দক্ষ হলেই চলবে না, তাদের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও অটল থাকতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমেই আমরা একটি উন্নত ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশ।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, ১৫ বছর ধরে আমাদের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে, যার একটি বড় অংশ হয়েছে সরাসরি ব্যাংক লুটের মাধ্যমে। তবে এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়েছে হিসাবসংক্রান্ত তথ্যের কারচুপির মাধ্যমে। হিসাববিদদের প্রতি অনুরোধ জানাব, সবাই মিলে এমনভাবে কাজ করুন যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি আর না ঘটে।’

পেশাজীবী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মান নির্ধারকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে সম্মেলনে আইএফএসির প্রেসিডেন্ট জ্যঁ বুকো বলেন, ‘সততা ও জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে এআই পরিচালনা করতে পারলে হিসাববিদরা অনিশ্চয়তাকে সুযোগে পরিণত করতে পারবেন।’

এ সময় আইসিএবির সভাপতি এনকেএ মোবিন বলেন, ‘এটি পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযাত্রা। নৈতিক এআই ও টেকসই প্রতিবেদনের পথে এগিয়ে যেতে সততা, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার চিরন্তন মূল্যবোধই আমাদের পথ দেখাবে। বিশ্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নৈতিক, দক্ষ ও দূরদর্শী হিসাববিদের প্রয়োজন অনুভব করছে। আইসিএবি বৈশ্বিক সর্বোৎকৃষ্ট মান বজায় রাখতে বিভিন্ন পেশাগত পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।’

আদীব হোসেন খান জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্বন নিরূপণ এবং রিয়েল-টাইম ইএসজি কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের মতো উদীয়মান এআই প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতার অভাব, বিচ্ছিন্ন ইএসজি তথ্য এবং পক্ষপাতের ঝুঁকি মোকাবেলায় যথাযথ নৈতিক কাঠামো না থাকলে জনআস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘নৈতিক এআইয়ের কাজ কেবল প্রতিবেদন স্বয়ংক্রিয় করা নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত করা। উন্নত প্রযুক্তি দায়িত্ব কমায় না, বরং তা আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘নিরীক্ষা, জনস্বার্থ তদারকি ও মানদণ্ড অনুসরণে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে পেশাদার হিসাববিদরাই এ পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।’

সম্মেলনে জাতীয় নেতৃত্ব, হিসাববিদ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কৌশলগত সংলাপ এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা থেকে আগত প্রতিনিধিরা। সম্মেলনে তিনটি টেকনিক্যাল সেশন ও একটি সমাপনী সেশনে ভবিষ্যৎ পেশা, এআই ও টেকসই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করা হয়। উল্লেখ্য, সাফা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল বণিক বার্তা।