ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ভবন সংস্কার নিয়ে দেয়া সাক্ষ্যের জেরে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের হুমকি দিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সমনও জারি করা হয়েছে। বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি সুদহার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেরোম পাওয়েলের মধ্যকার বিরোধের জের হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এটি গোটা বিশ্বেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি নির্ধারণের স্বাধীনতার ওপর সরকারি হস্তক্ষেপের এক মারাত্মক নজির তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। খবর এপি।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক খাত ও জাতীয় মুদ্রানীতির অভিভাবক হিসেবে ফেড একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ফেডের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি সুদহার না কমানোয় ট্রাম্প বারবার পাওয়েলের সমালোচনা করেছেন। এমনকি তাকে বরখাস্ত করার হুমকিও দিয়েছেন।

ট্রাম্পের দাবি, অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবং ফেডারেল সরকারের ঋণের ওপর সুদের বোঝা কমাতে ফেডকে ঋণগ্রহণের খরচ কমাতে হবে। যদিও ২০২৫ সালের শেষ চার মাসের মধ্যে তিন মাসই সুদহার কমিয়েছে ফেড। যদিও ট্রাম্পের ক্ষোভ তাতে প্রশমিত হয়নি।

ট্রাম্পের আরো অভিযোগ, ফেডের ২৫০ কোটি ডলারের ভবন সংস্কার প্রকল্পটি পাওয়েল সঠিকভাবে পরিচালনা করেননি। আর জেরোম পাওয়েল বলেছেন, তার বিরুদ্ধে দেয়া ফৌজদারি অভিযোগের এ হুমকি মূলত সুদহার নির্ধারণে ফেডের স্বাধীনতা খর্বের ‘অজুহাত’ মাত্র।

ফেডের নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকিতে গঠিত মার্কিন সিনেট কমিটির সদস্য নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে থাকা উপদেষ্টারা ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার অবসান ঘটাতে সক্রিয়ভাবে চাপ দিচ্ছেন। এ নিয়ে যদি কারো সামান্যও সন্দেহ থেকে থাকে, এখন তা আর থাকার কথা নয়।’

অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো ফেডারেল রিজার্ভও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে। অর্থনীতির দুর্বল পরিস্থিতিতে ফেড ঋণের স্বল্পমেয়াদি সুদহার কমিয়ে ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয়কে সুলভ করে তোলে। এতে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত হয়। আবার মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধে প্রয়োজনমতো সুদহার বাড়িয়ে মুদ্রাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে যাতে এর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

বরাবরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে প্রায়ই সুদহার বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতে অর্থায়নের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাড়ি, গাড়ি বা গৃহস্থালি সামগ্রী কেনার জন্য ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়লেও মুদ্রাপ্রবাহ কমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এরই মধ্যে তুরস্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়নের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মক চাপে ফেলে দিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ২০২০-এর দশকের শুরুতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদহার কমিয়ে রাখতে বাধ্য করেছিলেন। এর প্রভাবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৮৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে তুর্কি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুটা স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়নের সুযোগ দেন তিনি। এতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদহার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ নির্ধারণের সুযোগ পায় তুর্কি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর প্রভাবে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আগের তুলনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

ফেডারেল রিজার্ভকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন ও সরকারি প্রভাবমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের কাছে ফেডের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়ার গুরুত্ব বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চাপে সুদহার কমিয়ে রেখেছিলেন তৎকালীন ফেড চেয়ারম্যান আর্থার বার্নস। নিক্সনের আশঙ্কা ছিল সুদহার বাড়লে নির্বাচনে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন।

১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার পল ভলকারকে ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। পল ভলকার স্বল্পমেয়াদি সুদের হার প্রায় ২০ শতাংশে নিয়ে যান, যা ছিল অভাবনীয়। ওই উচ্চ সুদহার তীব্র মন্দা ডেকে আনে, বেকারত্ব প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছে যায় এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। তবু ভলকার পিছু হটেননি। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি আবার এক অংকে নেমে আসে। অর্থনীতির দুর্বিপাকের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পল ভলকারের দৃঢ়তা ফেডের স্বাধীন মূল্যবোধের এক বড় উদাহরণ হয়ে আছে। তবে এ স্বাধীনতা একেবারে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ফেড চেয়ারম্যানকে বছরে দুবার অর্থনীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ে মার্কিন পার্লামেন্টের দুই কক্ষের প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহি করতে হয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বেঞ্চমার্ক সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত চার মাসে তিন দফায় সুদহার কমিয়েছে ফেড। তবে এর পরও কেন্দ্রীয় সুদহার নীতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বরং ফেডের সুদহার নীতিকে রীতিমতো অপরাধমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের যেকোনো প্রয়াস ওয়াল স্ট্রিটে ধস নামাবে এবং এ প্রবণতা বিশ্বের অন্যান্য স্থানের পুঁজিবাজারেও সংক্রমিত হবে। শেয়ারবাজারে ধসের বিপরীতে বাড়বে বন্ডের ইল্ড। এতে সরকারি ঋণ, মর্টগেজ, কার লোন ও ক্রেডিট কার্ডের সুদও বেড়ে যাবে। বিশ্লেষকদের এ আশঙ্কার প্রতিফলন গত সোমবারের পুঁজিবাজারে দেখা গেছে। ওইদিন জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে সমন জারির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর লেনদেন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিটের সব বেঞ্চমার্ক সূচকের পতন হয়। বন্ডের ইল্ড বেড়ে যায় এবং ডলারের বিনিময় হার কমে যায়।

শুধু তাই নয়, ফেডের স্বাধীনতা খর্ব হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়নের স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক নজির সৃষ্টি হবে, যা বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও অনুসরণ করার জোর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাজারে বিনিয়োগকারীরাও বরাবরই ফেডের স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষে মত দিয়ে এসেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, এতে রাজনীতির প্রভাব ছাড়াই মূল্যস্ফীতি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ফেডের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত আগে থেকে বোঝা যায়। ফেড কর্মকর্তারা প্রায়ই প্রকাশ্যে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদহার নীতিতে কী কী পরিবর্তন আনা হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন। ফেড যদি রাজনৈতিক চাপে প্রভাবিত হওয়া শুরু করে, সেক্ষেত্রে আর্থিক বাজারসংশ্লিষ্টদের মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো পূর্বাভাস বা আগাম অনুমান তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিষয়টির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটররাও। আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মারকাউস্কি সোমবার বলেন, ‘চেয়ারম্যান পাওয়েলের সঙ্গে কথা বলার পর এটা স্পষ্ট যে প্রশাসনের এ তদন্ত আসলে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।’

ফেড স্বল্পমেয়াদি সুদহার নিয়ন্ত্রণ করলেও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যয় নির্ধারণ করে বাজার। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বেশি থাকলে তারা সরকারি বন্ড থেকেই বাড়তি মুনাফা তুলতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে গোটা অর্থনীতিতেই সার্বিক ঋণব্যয় কমে যাওয়ার পরিবর্তে উল্টো বেড়ে যাবে।

শুধু জেরোম পাওয়েল নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগে ফেডারেল রিজার্ভ গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করতে চাইছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। গত বছর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দেশটির স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর বিষয়ে দেয়া এক রায়ে ইঙ্গিত দেয়, কোনো চেয়ারম্যানের নীতিগত সিদ্ধান্ত অপছন্দ হলেই প্রেসিডেন্ট তাকে বরখাস্ত করতে পারেন না। তবে ‘যথোপযুক্ত কারণ দেখিয়ে’ (যেমন কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবহেলার ভিত্তিতে) অপসারণ করা যেতে পারে।

এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে ভবন সংস্কার প্রকল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে শেষ পর্যন্ত জেরোম পাওয়েলকে সরাতে হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আইনি লড়াইয়ে নামতে হতে পারে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানোরও জোর সম্ভাবনা রয়েছে।