উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণ ব্যর্থতায় দেশে প্রতি বছর বিপুল পেঁয়াজ, রসুন ও আলু নষ্ট হয়। এতে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময় পেঁয়াজ ও আলুর দামে অস্থিরতা থাকে। এ কারণে ধারাবাহিক উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য দুটি সংরক্ষণে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে সরকার।
চাহিদার উদ্বৃত্ত উৎপাদন সত্ত্বেও শুধু কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণের কারণে মৌসুম ছাড়া বাকি সময় বেশি দামে আলু বিক্রি হয়। গ্রীষ্মকালে আলুর বাড়তি দাম থাকলেও কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ খরচ দিতেই এর বড় একটি অংশ চলে যায়। এ কারণে পেঁয়াজ, রসুন ও আলু সংরক্ষণে বিশেষ কার্যক্রম শুরু করেছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণেই ১৫-২০ শতাংশ কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।
কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেশে এখন চাহিদার প্রায় সমপরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন হলেও সর্বশেষ মৌসুমে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৬ লাখ ৪১ হাজার টন। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের ২৫-৪০ শতাংশ বিক্রির আগ পর্যন্ত পচে যায়। যে কারণে এখনো শতভাগ আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। পেঁয়াজ সংরক্ষণে স্বল্পমূল্যের নতুন পদ্ধতির বাস্তবায়ন হলে আমদানি প্রক্রিয়া শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
পেঁয়াজের তুলনায় রসুনের পচনশীলতা কম (৭-১০ শতাংশ) হলেও বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এক মাস আগেও দেশে রসুনের প্রতি কেজি দাম (আমদানীকৃত) ২৫০ টাকায় ছিল। সে সময়ে দেশীয় রসুনের দামও বেড়ে কেজিপ্রতি ১৫০-১৬০ টাকায় চলে আসে।
আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ ১০টি দেশের অন্যতম হলেও সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে এর দাম বেশি থাকে। মূলত কোল্ড স্টোরেজে মজুদ খরচ যুক্ত করে বিক্রির কারণে ভোক্তাদের বাড়তি দামে আলু কিনতে হয়। কিন্তু এতে কৃষকরা লাভবান হন না। সরকারের নেয়া নতুন পদ্ধতির বাস্তবায়ন হলে ধারাবাহিকভাবে মৌসুম শেষেও ন্যায্যমূল্যে থাকবে আলুর দাম। পাশাপাশি কৃষকরাও স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তি মুনাফা করতে পারবে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন ও বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের অধীনে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ ও রসুনের ৩ হাজার ৬০০ টন বিনা খরচে সংরক্ষণ করতে পারবেন কৃষক। নতুন এ পদ্ধতি দেখে কৃষকও নিজ খরচে এ ধরনের সংরক্ষণ পদ্ধতি চালু করতে পারবেন। এতে উৎপাদনের পর বিপণন পর্যন্ত পচন ১৫-২০ শতাংশ এমনকি আরো বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে, পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ৩০০টি সংরক্ষণাগার তৈরি করা হবে। পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদনের শীর্ষ সাতটি জেলায় সংরক্ষণাগার নির্মাণ ছাড়াও ৩ হাজার ৯৪০ জন কৃষককে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রতিটি সংরক্ষণাগারে কৃষক বিনা খরচে ৩০০ মণ করে পেঁয়াজ কিংবা রসুন মজুদ করতে পারবেন ।
চালের পর দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৃষিপণ্য আলু। সর্বশেষ বছরে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। যদিও দেশে আলু ব্যবহার হয় ৭৭-৮০ লাখ টন। উদ্বৃত্ত আলুর মধ্যে এক লাখ টনেরও কম মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। মৌসুমের পর উৎপাদিত আলুর একটি বড় অংশ হিমাগারে রাখেন কৃষক কিংবা ব্যাপারীরা। হিমাগারে আলু রাখতে প্রতি কেজিতে ৪-৫ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তাছাড়া আলুর সংকট কিংবা বাড়তি দাম হলেও কৃষক চাইলেও নির্দিষ্ট সময়ের আগে হিমাগার থেকে আলু বের করতে পারেন না। এতে বছরের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আলুর দাম বাড়তি থাকলেও তার বড় একটি অংশই ব্যয় হয় হিমাগারের পেছনে। এ কারণে দেশে আলু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বল্প খরচে আধুনিক হিমাগার নির্মাণ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আলুর বহুমুখী ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন উন্নয়ন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক কিশোর কুমার সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন এ পদ্ধতিতে প্রতিটি মডেল সংরক্ষণাগারে ৭৫০ মণ আলু রাখলে ১০-১৫ কেজি আলু নষ্ট হবে। মাত্র দেড় লাখ টাকার মধ্যেই কৃষক চাইলে নিজেদের উদ্যোগে সংরক্ষণাগার নির্মাণ করতে পারবেন।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে পেঁয়াজ, রসুন কিংবা আলুর উৎপাদন চাহিদার সমপরিমাণ হলেও শুধু কম দাম পাওয়ায় পরবর্তী বছরগুলোয় উৎপাদন কমে যায়। এ ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ জরুরি।









