দুই অংকের ঘরে পৌঁছেছে মূল্যস্ফীতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিম্নমুখী রয়েছে প্রকৃত আয়। এ অবস্থায় ব্রিটিশ ভোক্তাদের আস্থা রেকর্ড নিম্নে দাঁড়িয়েছে। এমনকি এটি গত ৫০ বছরে চারটি গভীর অর্থনৈতিক মন্দার চেয়েও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান পণ্য ও সেবার দাম মনোবল কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিসাব অনুসারে যুক্তরাজ্য এখনো অর্থনৈতিক মন্দায় প্রবেশ করেনি। তবে বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান জিএফকের সর্বশেষ ব্যারোমিটার অনুযায়ী, মহামারীর শুরু থেকেই ভোক্তা আস্থা নিম্নমুখী হয়। ২০২১ সালে লকডাউন তুলে দেয়ার পর পর মাসভিত্তিক ভোক্তা আত্মবিশ্বাসে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি আবারো নিম্নমুখী রয়েছে। সর্বশেষ চলতি মাসে ব্রিটিশদের আস্থা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এ হার ১৯৭৪ সালে জরিপ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন।

গত মাসে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এ হার ১৯৮২ সালের পর সর্বোচ্চ। জুনেও মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। যদিও অর্থনীতিবিদরা গত মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

এদিকে মন্দার ঝুঁকি সত্ত্বেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) আক্রমণাত্মকভাবে সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। চলতি মাসের শুরুতে বিওই সুদের হার দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এ নিয়ে ১৯৯৫ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে সুদের হার এক লাফে অর্ধেক পয়েন্ট বেড়েছে। বিওই পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৩ শতাংশের চূড়ায় পৌঁছতে পারে।

এমন নেতিবাচক খবরে জনসাধারণের মনোভাব এখন গত ৫০ বছরে চারটি গভীর মন্দার চেয়েও খারাপ হয়েছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, আশির দশকের প্রথম দিকে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এবং দুই হাজার দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশ অর্থনীতি গভীর মন্দায় ডুবেছিল।

জিএফকে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে চলতি বছর ভোক্তা মনোভাব ক্রমাগত কমেছে। আগস্টে আগের মাসের চেয়ে আরো ৩ পয়েন্ট কমে রেকর্ড সর্বনিম্ন মাইনাস ৪৪-এ নেমেছে। গত বছরের একই সময়েও এ সূচক মাইনাস ৮ পয়েন্টে ছিল। ব্রিটিশ ভোক্তারা আগামী এক বছরে তাদের নিজস্ব অর্থের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে হতাশাবাদী (মাইনাস ৩১)। কারণ আগামী অক্টোবরে জ্বালানি ব্যয় আরো বাড়তে চলেছে। তবে অর্থনীতি নিয়ে তারা আরো বেশি হতাশ (মাইনাস ৬০)।

জিএফকের ক্লায়েন্ট স্ট্র্যাটেজি পরিচালক জো স্ট্যাটন বলেন, সামগ্রিক ভোক্তা আস্থা সূচক তৈরিতে ব্যবহার করা পাঁচটি মাপকাঠিরই পতন হয়েছে। এটি জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রতিফলিত করে। আমাদের উপসূচকগুলো ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর মাসভিত্তিক হিসাবে নিম্নমুখী রয়েছে।

তিনি বলেন, ভোক্তারা অর্থনীতিকে কেমন দেখছেন—সে সূচক গত বছরের শেষ দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আগস্টের স্কোর নতুন রেকর্ড মাইনাস ৬০ পয়েন্টে নেমেছে। এ ফলাফলগুলো আত্মসমর্পণের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ আর্থিক বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ব্রিটিশ পরিসংখ্যান সংস্থা অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসের প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, ১৪ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে রেস্তোরাঁর সংখ্যা পরিবর্তিত হয়নি। যদিও এ সময়ে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে রেস্তোরাঁয় অর্থ প্রদান ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।

পেশাদার পরিষেবা নেটওয়ার্ক কেপিএমজির কনজিউমার মার্কেট বিভাগের ব্রিটিশ প্রধান লিন্ডা অ্যালেট বলেন, পরিস্থিতি অতি দ্রুত জটিল হচ্ছে। জীবনযাপনের উচ্চ খরচ আগামী শরৎ ও শীতকালে আরো বেশি পরিবারের ব্যয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। ভোক্তা আস্থা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে থাকলেও চলতি বছরের এখন পর্যন্ত খুচরা বিক্রি নেতিবাচক পর্যায়ে যায়নি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় করার ক্ষমতা ব্যাপক কমে যাওয়ার কারণে চাহিদা কমে যাবে। এটি অর্থনীতিতে অন্ধকারে ফেলতে পারে।