প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশকে সঙ্গে নিয়ে যূথবদ্ধ হয়ে অগ্রসরের নামই উন্নয়ন। অথচ দেশে উন্নয়নের নামে পাহাড়-প্রকৃতির ক্ষতিসাধনেই মত্ত বিশেষ কিছু গোষ্ঠী। পরিবেশকে উপেক্ষা করে অবকাঠামো আর অর্থ আয়কে অভীষ্ট বানিয়েছে তারা। তাদের কৃতকর্মের মাশুল দিচ্ছে দেশের বহু অঞ্চল, যার মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম। পাহাড় চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ঐহিত্য হলেও ক্রমাগত নিঃশেষিত। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের অভিজাত আবাসিক এলাকা খুলশীর পাহাড়ের দুই-তৃতীয়াংশ কেটে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। হতবুদ্ধি করার মতো বিষয়টি হলো, চট্টগ্রামের খুলশী আবাসিক এলাকার কাছেই পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এমন কাণ্ড ঘটার পরও তারা কেন নিষ্ক্রিয় থাকছে, তা এক বড় প্রশ্ন।
পাহাড় কাটা ও চট্টগ্রামের পরিবেশগত অবনতি শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাগুলো ক্রমশ ব্যক্তিমালিকানার অধীনে চলে যাচ্ছে। একপর্যায়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলো সমতলভূমিতে পরিণত হচ্ছে। নগরায়নের বিকাশ হচ্ছে, পাহাড়ের মাটির দাম কম হওয়ায় নিচু জমি ভরাট করতে কাটা হচ্ছে পাহাড়। স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ট্রাক ব্যবসায়ী, মাটি কেনা-বেচা করে এমন ঠিকাদার, ইটভাটার মালিক, আবাসন কোম্পানি পাহাড় ধ্বংসে শামিল হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসন কোম্পানিগুলোর কেউই আমলে নিচ্ছে না চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদিত নকশা। মানা হচ্ছে না পরিবেশ সংরক্ষণ আইনও। পাহাড় কাটার কারণে ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে নগরের বিভিন্ন এলাকা। এছাড়া বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিঃশেষ হচ্ছে বনাঞ্চল। একই কারণে পলি জমে নালা-নর্দমা ভরাট ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে একাধিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে পাহাড়ি মাটি নেমে এসে শহরের নালা-খাল-নদী ভরাট হচ্ছে। সড়কের ওপর জমছে কাদা। তাছাড়া পাহাড়ধসের ঘটনা বাড়ছে। অন্যান্য পাহাড়ের শক্ত ভিত দুর্বল হয়ে বিলীন হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে গাছপালা, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে পাহাড় কাটা বন্ধ করার জন্য নির্দেশনা আছে। কিন্তু এর বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেই।
সবকিছু উপেক্ষা করে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। অথচ পৃথিবীর বড় শহর গড়ে উঠেছে পাহাড়ের চারপাশে। উঁচু পাহাড় অক্ষত রেখে ঢালু জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে মানুষের বসবাস উপযোগী জনপদ। একখণ্ড পাহাড় কিংবা একটা গাছও কাটা পড়েনি। যা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। ইতালির রোম, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন কিংবা নেপালের কাঠমান্ডু। উল্লিখিত শহরগুলোয়ও ভবন এবং অন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই। এটা সম্ভব হয়েছে শক্তিশালী পরিবেশ আইন, নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা, একাগ্রতা এবং দেশগুলোর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকার কারণে। ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণ পর্যায়ে তারা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে, পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছে এবং তদারকি বাড়িয়েছে। ফলে পাহাড় সত্ত্বেও ওইসব শহরে প্রাকৃতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ভবন ও নগর অবকাঠামো গড়ে তুলতে বেগ পেতে হয়নি।
দেশে পাহাড়ে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও নিয়ম-নীতি আছে, পরিবেশ অধিদপ্তর আছে। এছাড়া রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষও। অথচ আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পরিপালন ছাড়াই পাহাড় কেটে আবাসন ব্যবসায়ীরা বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন চট্টগ্রামে। মূলত আইন প্রয়োগে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর ঔদাসীন্যের কারণে সম্ভব হচ্ছে এটা। এর অবসান দরকার। কোন আবাসন কোম্পানিগুলো কোথায় পাহাড় কেটে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, আইনি প্রক্রিয়াগুলো ঠিকমতো অনুসরণ করছে কিনা, পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কিনা প্রভৃতি বিষয় খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দেশে পাহাড় কাটাসংক্রান্ত যেসব নিয়ম-নীতি আছে, সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে পাহাড় কাটতে পারবে না, অন্যথায় আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। যদিও এমন আইনের কার্যকারিতা পরিবেশ ধ্বংস রোধে সহায়ক কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার পরও আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।
২০০৭ সালে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পর গঠিত কমিটির সুপারিশমালার মধ্যে ছিল পাহাড় কেটে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশ কেটে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়ার ক্ষমতা কোনো একক সংস্থা, বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের হাতে না রাখা। বিভিন্ন সমিতির নামে পাহাড় ইজারা নিয়ে অথবা দখল করে যারা পাহাড় ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করে সেখানে অংশীদারত্বমূলক বনায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা। পাহাড় কাটা ও পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংস্থার দুর্বৃত্তায়ন কঠোর হাতে আইনানুগ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা। এসব সুপারিশের কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। ’৫২ সালের আইনে অনুমতি ছাড়া ইমারত নির্মাণ, জলাধার খনন বা ভরাট এবং পাহাড় খনন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ২০০৬ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় নির্মিতব্য ভবনের ভার জমি বহন করতে পারবে কিনা, তা যাচাই এবং নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইনে বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কোনো ইমারত বা স্থাপনা নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ, পুকুর বা কৃত্রিম জলাধার খনন বা পুনঃখনন কিংবা পাহাড় বা টিলা কাটা যাইবে না।’ বহুতল ভবন নির্মাণের সিডিএ অনুমোদন গ্রহণেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়ম হলো সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের পর বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিতে হয়। এজন্য ভূমি ব্যবহারের অনুমোদনপত্র, নকশা অনুমোদন, জমির খতিয়ান শ্রেণী, সিডিএর বসবাস উপযোগী নকশা অনুযায়ী কাজের সনদ যাচাই করে তারপর ছাড়পত্র দেয়া হয়। অনুমোদনকৃত নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা সেটি তদারকির দায়িত্বও সিডিএর। সব আইনই এক্ষেত্রে উপেক্ষিত, যা হতাশাজনক।
শুধু চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় এখনো পাহাড় কাটা চলছে। গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ বসতি, স্থাপনা ও ভবন। আবাসন কোম্পানিগুলো প্রাতিবেশিক ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করে নির্মাণ করছে সুরম্য বহুতল ভবন। সামনের দিনে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। বড় দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি নজরদারি বাড়াতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের। অন্যথায় আবাসন ব্যবসায়ীসহ অন্য দুর্বৃত্তদের অপতত্পরতা রোধ করা সম্ভব নয়। সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটার খবর এলেও প্রশাসনের উদাসীনতাই পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঞ্চলকে সংরক্ষণ আইনের আওতায় এনে পাহাড় কাটা কিছুটা রোধ করা গেলেও সর্বপ্রথম যে বিষয়টি একান্তভাবে প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে জনসচেতনতা এবং বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কারণ দেখা যায়, যারা রাতের আঁধারে পাহাড় কাটে, কর্তৃপক্ষ তাদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হলেও আইনের মাধ্যমে শাস্তি দিতে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ।
পাহাড় ধ্বংসকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব। প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন সুচারুভাবে নিশ্চিত করতে হবে তাদেরই। এছাড়া মামলা পরিচালনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড় কাটা বন্ধে অব্যাহত নজরদারি, কঠোর এনফোর্সমেন্ট অভিযান, পরিবেশ আইনের শতভাগ প্রয়োগ, আদালতে দক্ষতার সঙ্গে মামলা পরিচালনা এবং পাহাড়জুড়ে বৃক্ষায়ন-বনায়ন, পানি নিষ্কাশনে ড্রেনেজ স্থাপন, পাহাড়ের মাটির পতন রোধে সিলট্র্যাপ (ফাঁদ), গাইডওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে নিরাপদ বেষ্টনী গড়ে তোলাই পাহাড় রক্ষার প্রধান সূত্র। এক্ষেত্রে কোনো উদাসীনতা কাম্য নয়।










