বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি অনন্য দিন। ইতিহাস থেকে এ দিনটিকে মুছে ফেলা যাবে না। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তার পেছনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমার বিবেচনায় এ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতীয় সেনা কমান্ডের কাছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সামনে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে, নাকি বাইরের কোনো শক্তি তা নির্ধারণ করে দেবে—এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর পরই।
এ প্রসঙ্গে যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের কথিত সাত দফা গোপন চুক্তি এবং স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমার মতে, এসব চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গোপন চুক্তিতে বাংলাদেশের নিজস্ব সেনাবাহিনী না রাখা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয় ছিল বলে বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে ২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী।
অন্যদিকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। বাক্স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে এসব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। আওয়ামী লীগসহ অন্য সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করা হয়। চারটি সংবাদপত্র ছাড়া দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংসদে মাত্র ১২ মিনিটের আলোচনায় এ পরিবর্তন অনুমোদিত হওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্রহীনতা, স্বৈরশাসন, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতির কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তনের কোনো গণতান্ত্রিক পথও তাদের সামনে ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায় এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে। বিদেশে থাকায় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। তবে এ ঘটনার পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শেখ মুজিবের স্বৈরশাসন, অপশাসন, দলীয় লোকজনের দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের ভেতরেই তার শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হয়। অভ্যুত্থানের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর। নতুন মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যও ছিলেন আগের সরকারের মন্ত্রী। অর্থাৎ ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান বাইরের কোনো রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তে আওয়ামী লীগ সরকারের অভ্যন্তরীণ বলয় থেকেই সংঘটিত হয়েছিল।
এরপর বাকশাল ভেঙে দেয়া হয় এবং সংবাদপত্র প্রকাশের স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত হয়। তবে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ এ পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনি। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তার বক্তব্য ছিল, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আরেকটি অভ্যুত্থান প্রয়োজন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। ওই সময় ঢাকার আকাশে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায়। বঙ্গভবন পাহারায় থাকা ট্যাংক বাহিনীকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। ৩-৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশ কার্যত এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ছিল না। সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ও হতাশা বাড়তে থাকে। তাদের আশঙ্কা ছিল, দেশে আবারো বাকশালী শাসন ফিরে আসতে পারে।

এ আশঙ্কাকে আরো জোরালো করেছিল ৪ নভেম্বরের একটি মিছিল। তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের উদ্যোগে আয়োজিত ওই মিছিলে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। মিছিলকারীরা কালো পতাকা ও কালো ব্যাজ নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যান। মিছিলে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের মা ও তার ভাই রাশেদ মোশাররফও অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে রাশেদ মোশাররফ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে এ মিছিলকে আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে মনে হয়েছিল।
অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে বসে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান নিয়োগসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের ধারণা ছিল, জিয়াউর রহমান বাইরে থাকলে তার পক্ষে অভ্যুত্থান পরিচালনা করা কঠিন হবে। জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের জন্যও পরিচিত ছিলেন।
৬ নভেম্বর বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। সেদিন রাতেই তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সংসদ ভেঙে দেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়নি, বরং পরিস্থিতি আরো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
এ সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাও সক্রিয় ছিল। জাসদের সহযোগী সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাসদস্যদের মধ্যে সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের স্লোগান ছিল, ‘সিপাহি জনতা ভাই ভাই, সেনা অফিসারদের রক্ত চাই’। এ ধরনের স্লোগান সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও কাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল। এর ফলে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। আমার বিবেচনায়, এটি ছিল অত্যন্ত আত্মঘাতী ও দেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।
এমন পরিস্থিতিতে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহ শুরু হয়। সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন এবং তাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান। জিয়াউর রহমান প্রথমে পরিস্থিতি বুঝতে তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলোচনা করেন। জাসদের পক্ষ থেকে তাকে শহীদ মিনারে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করা। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই পথে যাননি। তার ঘনিষ্ঠজনরা তাকে বোঝান, ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যাওয়া উচিত হবে না। জাতির উদ্দেশে তার বক্তব্য রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচারিত হওয়াই সমীচীন।
এরপর তিনি রেকর্ড করা বক্তব্যে বলেন, ‘আমি জিয়া বলছি, আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন, শান্ত থাকুন। আপনাদের জীবন এখন নিরাপদ।’ তার এ বক্তব্য মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। ভোর হওয়ার আগেই হাজার হাজার সৈনিক সামরিক যান নিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে ছিল বেশ কয়েকটি ট্যাংক। সৈনিকরা ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ ও ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে থাকেন। সাধারণ মানুষও তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। এভাবেই ঘটনাটি সৈনিক ও জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এ কারণে ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করা হয়।
এ অভ্যুত্থানের গুরুত্ব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে অফিসারদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তখন সংখ্যায় খুব বড় ছিল না। সামরিক কর্মকর্তাদের নিশ্চিহ্ন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। আর সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও বিপন্ন হতে পারত। একটি সেনাবাহিনীহীন ভূখণ্ড কার্যত নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সক্ষমতা হারায়। সে বিবেচনায় ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকেই সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নানা সময়ে সামনে এসেছে। কেউ আমার এ বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হবেন, কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন। তবে আমার কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অভ্যুত্থানের মধ্যে জনগণের সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের আকাঙ্ক্ষা ছিল, অন্যদিকে বাংলাদেশের ওপর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রভাব ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা চিরকাল মনে রাখবে’ বক্তব্য কিংবা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করার বক্তব্য এ বিতর্ককে আরো জোরালো করেছিল। আমার মতে, এ সময় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছিল। পাশাপাশি অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিপর্যয়, দুর্নীতি এবং গুটিকয়েক অলিগার্কের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্তমান সরকারের জন্য এ ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না। এক্ষেত্রে তাদের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বুঝতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি সংকটকাল—১৯৭১ ও ১৯৭৫ সালের নভেম্বর—বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশের মানুষ যখন দিশাহারা, তখন জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি মানুষের মধ্যে সাহস ও আশার সঞ্চার করেন। তিনি তখন একজন সাধারণ মেজর ছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার পরিচিতি ছিল না। কিন্তু তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে মানুষ বুঝতে পেরেছিল, প্রতিরোধের লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তার বক্তব্য মানুষকে হতাশা কাটিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা দিয়েছিল।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরেও তিনি সংকটের মুহূর্তে মানুষের কাছে আশ্রয় ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার মুক্তির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং রাজপথে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে যে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে। এ দুই সংকটকালে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার মধ্যে একটি মিল রয়েছে—তিনি এমন সময়ে সামনে এসেছিলেন, যখন দেশের মানুষ দিশা খুঁজছিল।
বাংলাদেশকে ভবিষ্যতেও নানা ধরনের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবেলা করতে হতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামও শেষ হয়ে যায়নি। এ সংকট কখনো রাজনৈতিক, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো কূটনৈতিক কিংবা অন্য কোনো রূপে সামনে আসতে পারে। সেসব পরিস্থিতিতে জনগণের সচেতনতা, ঐক্য ও সংগঠিত অবস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নেতার পক্ষে জনগণের সমর্থন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কিছু করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, জনগণই নেতা সৃষ্টি করে; জনগণ না থাকলে নেতার কোনো মূল্য থাকে না।
আমরা চাই, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন থাকুক, ঐক্যবদ্ধ থাকুক এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করুক। বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, তারা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সেই সংকট মোকাবেলা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও জনগণের আস্থাকে গুরুত্ব দেয়ার দিকগুলো অনুসরণ করবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়াই হওয়া উচিত তাদের প্রধান দায়িত্ব।
ড. মাহবুব উল্লাহ্: অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক










