যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে তৈরি হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা। এতে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ারবাজারে ধসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার বাজারেও। গতকাল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা যায়। তবে দিনের শেষ দিকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এশিয়ার কয়েকটি বাজার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার লেনদেন এবং বড় কয়েকটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। খবর রয়টার্স ও দ্য ন্যাশনাল।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে গত বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতে বড় দরপতন হয়। এতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলার কমে যায়। প্রযুক্তি কোম্পানির আধিক্য থাকা নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। ১৯ মাসের মধ্যে একদিনে এটিই ছিল সূচকটির সবচেয়ে বড় পতন। এ দরপতনের ফলে সূচকটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কারেকশন টেরিটরি’ বা সংশোধনমূলক বাজারে প্রবেশ করেছে। গত ৬ অক্টোবরের রেকর্ড উচ্চতা থেকে সূচকটি নেমে এসেছে প্রায় ১০ শতাংশ নিচে।

এদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ১ হাজার ৮৩৩ পয়েন্টের বেশি বা ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। গত বছরের এপ্রিলের পর তিনটি প্রধান সূচকের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে খারাপ দিন। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এবারের দরপতনের তাৎক্ষণিক কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসে দলটির প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে এআই খাতে আরো কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে বেড়েছে উদ্বেগ। এআই প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়নে এসব কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এগুলোর জন্য বিপুল বিদ্যুৎ, জমি ও অর্থের প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় এসব কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিকদের বিরোধিতা বাড়ছে।

নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অনেকেই নির্বাচনী প্রচারে বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। কেউ কেউ দিয়েছেন এ খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিও। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স দেশজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেয়ারবাজারের এ ভয়াবহ দরপতনের জন্য সরাসরি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এআই অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এআই খাতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হলেও সেখান থেকে কবে এবং কতটা মুনাফা আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ঋণের সুদহার বেশি থাকায় এসব প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

ওয়াল স্ট্রিটে গত বৃহস্পতিবার চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় পতন হয়। দেশটির প্রধান সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর পরিমাপকারী ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক একদিনেই প্রায় ১২ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। পুরো সপ্তাহে সূচকটির পতন প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছায়। এনভিডিয়া, ব্রডকম ও কোয়ালকমের মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও বড় দরপতন হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের এ নেতিবাচক প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ায়। এ অঞ্চলের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির বড় প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিক এআই বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে এসব কোম্পানির ব্যবসা ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।

লেনদেনের একপর্যায়ে গতকাল জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দিনশেষে সূচকটি ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৫৭ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে অবস্থান করে। মে মাসের পর এ প্রথম সূচকটি ৬০ হাজার পয়েন্টের নিচে নামল। দেশটির বিস্তৃত বাজারের সূচক টপিক্সও প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।

জাপানের প্রযুক্তি ও চিপসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বেশি চাপ দেখা গেছে। চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারদর ৮ শতাংশের বেশি কমেছে। রোহমের কমেছে ১৫ শতাংশ। ফুরুকাওয়া ইলেকট্রিকের শেয়ারদর ৮ শতাংশের বেশি এবং সফটব্যাংক গ্রুপের প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কসপিও একপর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এ কারণে বিএসই বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ার লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য বন্ধ রাখতে ‘সার্কিট ব্রেকার’ চালু করতে বাধ্য হয়। পরে লেনদেন শুরু হলে সূচকটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। দেশটির দুই চিপ উৎপাদনকারী জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ার বড় দরপতনের মুখে পড়ে। বিশেষ করে এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর একপর্যায়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়।

তাইওয়ানের শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক তাইএক্স কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। দেশটির বড় চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। এছাড়া হংকং, সাংহাই, সিডনি ও সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারেও ১ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে গতকাল কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যায়। নাসডাক ১০০ সূচকের ফিউচার লেনদেনে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচারে দশমিক ৩৯ শতাংশ দরবৃদ্ধি হয়। তবে ডাও জোনসের ফিউচার লেনদেনে পতন অব্যাহত ছিল।

এনভিডিয়ার শেয়ারদর প্রাক্‌-বাজার লেনদেনে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এএমডি, ইনটেল, ব্রডকম ও মাইক্রোন টেকনোলজির শেয়ারদর বেড়েছে ৫ থেকে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং এআই অবকাঠামোর সরঞ্জাম সরবরাহকারী কোম্পানির শেয়ারেও দরবৃদ্ধি দেখা গেছে।

এ ঘুরে দাঁড়ানোকে বাজারের স্থায়ী পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ, নতুন নিয়ন্ত্রণ এবং অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বিদ্যমান। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও সুদহার বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শেয়ার ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা আরো কিছুদিন থাকতে পারে।