উৎপাদন খরচ কমানো ও সময় বাঁচাতে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ বা থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের রিভিয়ান, ফোর্ড ও জেনারেল মোটরস (জিএম) বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এ প্রযুক্তিতে। গাড়ির যন্ত্রাংশ, কারখানার সরঞ্জাম ও পরীক্ষামূলক উপকরণ তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টার। এতে যন্ত্রাংশ তৈরির সময় কয়েক সপ্তাহ থেকে কমে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টায় নেমে আসছে। খবর সিএনবিসি।
থ্রিডি প্রিন্টিংকে অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিংও বলা হয়। কম্পিউটারে তৈরি নকশা অনুযায়ী স্তরে স্তরে উপাদান যোগ করে এতে তৈরি করা হয় ত্রিমাত্রিক বস্তু। প্লাস্টিক, ধাতু, সিরামিক ও বিভিন্ন যৌগিক উপাদান দিয়ে এসব পণ্য বানানো যায়। প্রযুক্তিটি কয়েক দশক ধরে থাকলেও এখন গাড়ি শিল্পে এর ব্যবহার বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) নির্মাতা রিভিয়ান থ্রিডি প্রিন্টিং যন্ত্রপাতিতে ৫০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এ কার্যক্রমে ব্যবহৃত উপকরণের পেছনে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৭ লাখ ডলার। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সাধারণত এক বছরের মধ্যেই যন্ত্রগুলোর বিনিয়োগ উঠে আসে।
রিভিয়ানের প্রটোটাইপ উৎপাদন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক জনাথন ড্যানকেনব্রিং বলেন, ‘এ প্রযুক্তি যন্ত্রাংশ তৈরির খরচ কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ও কমায়। রিভিয়ানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উৎপাদনের গতি বাড়ানো।’
প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রিক মোটরের পরীক্ষামূলক মডেল, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন সরঞ্জাম তৈরিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট ও ইলিনয়ের নিজেদের কারখানায় আরো থ্রিডি প্রিন্টার বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারবেন।
ফোর্ডও নিজেদের প্রায় ২৩টি কারখানায় থ্রিডি প্রিন্টিং ল্যাব চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তরের কাছে এফ-১৫০ পিকআপ তৈরির কারখানায় থ্রিডি প্রিন্টে তৈরি যন্ত্রাংশ রাখার জন্য ভেন্ডিং মেশিন বসানো হয়েছে। কর্মীরা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিতে পারেন।
ফোর্ডের প্রকৌশলী গ্রেগরি ফোরেসি জানান, প্রায় দুই ডজন প্রিন্টার ব্যবহার করে হাজার হাজার সরঞ্জাম তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে কর্মীদের নকশা করা বিশেষ যন্ত্রপাতিও রয়েছে। একটি অ্যাপের মাধ্যমে কর্মীরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বা সরঞ্জাম তৈরির অনুরোধ জানাতে পারেন।
একবার একটি কারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে বড় একটি যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়েছিল। সরবরাহকারীর কাছ থেকে নতুন যন্ত্রাংশ আসার অপেক্ষা না করে ফোর্ড থ্রিডি প্রিন্টারে অস্থায়ী যন্ত্রাংশ তৈরি করে। এতে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়নি।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ২৩টির বেশি কারখানায় থ্রিডি প্রিন্টিং ল্যাব চালুর লক্ষ্য রয়েছে ফোর্ডের। বর্তমানে তাদের এ কার্যক্রমে ২০০টির বেশি প্রিন্টার রয়েছে।
অন্যদিকে জেনারেল মোটরস গবেষণা, উন্নয়ন ও কারখানার কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ি ক্যাডিলাক সেলেস্টিকে থ্রিডি প্রিন্টে তৈরি ১৩৫টি যন্ত্রাংশ রয়েছে। ক্যাডিলাক ব্ল্যাকউইং মডেলের গাড়িতেও এ প্রযুক্তির তৈরি বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।
থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্রাটাসিসের কর্মকর্তা ফাদি আব্রো বলেন, ‘উপকরণের মান উন্নত হওয়ায় এ প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে আরো বেশি প্রতিষ্ঠানে এর ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে প্রিন্টারের গতি বাড়ানো এবং খরচ কমানো জরুরি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত যন্ত্রাংশ তৈরি, সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কারখানার উৎপাদন সচল রাখার ক্ষেত্রে থ্রিডি প্রিন্টিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে গাড়ি নির্মাতারা প্রযুক্তিটিকে পরীক্ষাগারের বাইরে নিয়ে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রমের অংশ করে তুলছেন।










