স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম যতটা প্রয়োজনীয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসক। চিকিৎসক না থাকলে রোগী স্বাস্থ্যসেবা পায় না। আবার পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসকের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা পেতে রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। দুঃখজনকভাবে এ অভাবই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম সংকট। ঝিনাইদহের চারটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি এরই প্রতিচ্ছবি।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এ জেলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা; ২০১৮ সালে উদ্বোধন করা হয়। এরপর প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক সংকটে কেন্দ্রগুলোয় পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যায়নি। প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন করে চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়। কিন্তু সুপারিশের বাস্তবায়ন আজও হয়নি। ফলে গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ নবজাতকদের জরুরি চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এর আগেও গাজীপুর, নড়াইল, ভোলা, যশোরসহ বহু মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে জনবল সংকট হওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার খবর সময়ে সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে এ সংকট কেবল মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসহ প্রায় সর্বত্রই চিকিৎসক ও জনবল ঘাটতি রয়েছে। বিশেষত এ ঘাটতি প্রান্তিক পর্যায়ে তুলনামূলক প্রকট। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে এ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে মা ও শিশুস্বাস্থ্য, জরুরি চিকিৎসা এবং সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায়।
চিকিৎসক সংকটের ব্যাপ্তি বোঝা যায় জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানেও। গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসারে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে দশমিক ৫ জন চিকিৎসক নিশ্চিত করতে দেশে প্রয়োজন প্রায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসক। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১১ হাজারের বেশি। অর্থাৎ অপর্যাপ্ত চিকিৎসক কেবল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে তা নয়, দেশে অনুমোদিত পদের বিপরীতেও রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকা উদ্বেগজনক।
চিকিৎসকের সংখ্যার পাশাপাশি তাদের অসম বণ্টনও লক্ষণীয়। ডব্লিউএইচওর ২০২৪ সালের হিউম্যান রিসোর্সেস ফর হেলথ কান্ট্রি প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালে সরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের ৭৫ শতাংশ ছিলেন শহরাঞ্চলে, বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে ছিলেন মাত্র ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবার জন্য গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তুলনামূলক কমসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি খাতের ৭৫ শতাংশ চিকিৎসক ও নার্সই তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক ও জনবলের উপস্থিতি রোগ শনাক্ত, প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসকের ঘাটতি শুধু সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ কমাচ্ছে না, বরং বড় হাসপাতালগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতির পেছনে শুধু চিকিৎসকের স্বল্পসংখ্যা দায়ী নয়; নিয়োগ, পদায়ন ও জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ও চিকিৎসক তৈরির সুযোগ বাড়লেও সে অনুপাতে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোয় জনবল নিশ্চিত করা যাচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনা প্রয়োজন। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ, আবাসন, নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকায় সেখানে চিকিৎসকদের ধরে রাখাও কঠিন। কোথাও অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকছে, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক কম, আবার কোথাও চিকিৎসক থাকলেও কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী। এটি বাস্তবায়ন হলে সংকট কিছুটা কমবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে। তবে নিয়োগের পাশাপাশি জনবল ব্যবস্থাপনায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া চাই। আবার নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা যেন না হয় সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে থাকতে উৎসাহিত করতে পর্যাপ্ত আবাসন, নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারক ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিও সমন্বিতভাবে পূরণ করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা; একজন চিকিৎসকের উপস্থিতিই হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চিকিৎসক তৈরির পরিকল্পনাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কোন অঞ্চলে কতজন সাধারণ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, কোন পর্যায়ের স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে কী ধরনের জনবল দরকার এবং ভবিষ্যতে জনসংখ্যা ও রোগের ধরন বিবেচনায় কী পরিমাণ চিকিৎসক প্রয়োজন হবে—এসব নির্ধারণ করে জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সুষম বণ্টন এবং কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।










