১৯৭৪ সালের শেষ দিকে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আমি তখন দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে মানুষ আমার কাছে বাংলাদেশের খবর জানতে চাইত। কিন্তু দেশ থেকে যে খবর আসত, তার বড় অংশজুড়েই থাকত দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট ও মানুষের দুর্ভোগের চিত্র।

অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের শুরুতে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। একদিকে দেশে খাদ্য সংকট ও মানুষের দুর্দশা, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও আনুষ্ঠানিকতা চলছিল। সাধারণ মানুষ তখন অত্যন্ত নিপীড়িত ও অসহায় অবস্থায় ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ১৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানকে সামনে আনা হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, জ্যেষ্ঠতা ও সামরিক যোগ্যতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তার একাডেমিক যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রতিভাবান মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন অনেক সময় হয় না। সেনাবাহিনীতে তাকে প্রধানের পরিবর্তে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে তাকেই দায়িত্ব নিতে হয়।

এরপর ৭ নভেম্বর আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময়ও আমি দেশে ছিলাম না, ফলে ঘটনাটির ভেতরের বিষয়গুলো সরাসরি জানি না। তবে পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করেন এবং নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনে তিনি বিপুল বিজয় অর্জন করেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জেনারেল এমএজি ওসমানী।

জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার সততা ও পরিশ্রম। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এ নীতি অনুসরণ করতেন। তার ভাই, আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন না। বরং তিনি তাদের নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতেন। এমনকি তার আপন ভাইকেও সাধারণ মানুষ চিনত না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ককে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেননি। আমার বিবেচনায় এমন নীতিবান নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। উন্নয়নকাজেও তিনি পরিশ্রমের ওপর গুরুত্ব দিতেন। বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে সরাসরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

তার রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ। তিনি আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনীতি করার সুযোগ তৈরি করেন। সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র প্রকাশের সুযোগ দেয়াও তার রাজনৈতিক উদ্যোগের অংশ ছিল।

o0s

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের কিছু উদ্যোগ ছিল সময়ের তুলনায় অগ্রসর। ১৯৭৬ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) প্রতিষ্ঠা এর একটি উদাহরণ। স্বাধীনতার পর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার কারণে পুঁজিবাজারের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। জিয়াউর রহমান বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। সেই ধারায় পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরিতে আইসিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন দেশের অর্থনীতি ছিল ছোট ও কৃষিনির্ভর; পুঁজিবাজারের কার্যক্রমও ছিল সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল দূরদর্শী পদক্ষেপ। আইসিবির সদস্যপদের শেয়ারের মূল্য তখন ৪০ হাজার টাকা ছিল, যা পরবর্তী সময়ে ১ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অর্থনীতির অবস্থা বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, তিনি ভবিষ্যতের প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিলেন।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানির পথ সম্প্রসারণ হওয়ায় পরবর্তী সময়ে প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, ওআইসির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগও ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা নিয়েও তিনি কাজ করেছিলেন। তার প্রস্তাবিত সার্ক পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

জিয়াউর রহমান শিক্ষিত ও যোগ্য মানুষের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে সম্পৃক্ত করতেন। একবার অধ্যাপকদের বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সঙ্গে খাবার খেতে বসেন এবং নিজে এগিয়ে গিয়ে জানতে চান, খাবার ঠিকমতো হয়েছে কিনা। যাদের রাজনৈতিক অবস্থান তার সঙ্গে এক ছিল না, তাদেরও সম্মান করতেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতার মূল্যায়নের এ প্রবণতা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ।

খালেদা জিয়ার মধ্যেও সততা, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার মূল্যবোধ ছিল। প্রথাগত শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত না হলেও তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ছিল। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতা তিনি বরদাশত করতেন না বলেই আমার ধারণা। নানা প্রতিকূলতা, মামলা ও কারাবাসের মধ্যেও আপস না করার অবস্থান তার নেতৃত্বের একটি দিক।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার প্রত্যাশা, তিনি যেন তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মৌলিক মূল্যবোধগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগান। সততা, পরিশ্রম ও মেধার মূল্যায়ন— তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখন অনেক ক্ষেত্রে তোষামোদকারী ও ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা বেশি গুরুত্ব পান। অথচ প্রকৃত প্রতিভাবান মানুষেরা সবসময় নেতাদের কাছে গিয়ে নিজেদের প্রচার করেন না। তাদের খুঁজে বের করে দায়িত্ব দিতে হয়। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া তাদের সময়ে যোগ্য ও দক্ষ মানুষকে সামনে এনেছিলেন। বর্তমান সরকারেরও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা উচিত।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি জাতীয় ঐক্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ নিয়েও ভাবার উপলক্ষ। জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। তবে বহুদলীয় রাজনৈতিক পরিসর, মেধার মূল্যায়ন, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সততা ও পরিশ্রমের ওপর গুরুত্ব দেয়ার মতো বিষয়গুলো থেকে বর্তমান সরকার শিক্ষা নিতে পারে। অতীতের নেতৃত্বকে স্মরণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা। বর্তমান বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, যোগ্যতা ও জাতীয় সংহতিকে অগ্রাধিকার দেবে—এটাই প্রত্যাশা।

অধ্যাপক আবু আহমেদ: চেয়ারম্যান, আইসিবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক