৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশীদের জাতীয় জীবনের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর আমাদের সামষ্টিক জীবনে এমন তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত আর আসেনি। ৭ নভেম্বরের মুহূর্তকে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল বিভিন্নভাবে ও ভিন্ন ভিন্ন বয়ানে স্মরণ করে থাকে, তবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির পর কার্যত নেতৃত্বশূন্য ও হতবিহ্বল অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করে বিশৃঙ্খলা ও দেশবিরোধী মহলের সকল অপচেষ্টাকে দূর করে একটি শক্তিশালী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল ও স্বনির্ভর অবস্থানে নিয়ে আসতে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বর রাত পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল। ৭ নভেম্বরের পার্শ্বচরিত্র অনেক হলেও, ৭ নভেম্বরের মূল চরিত্র একজনই, তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।
শুরুতেই যেহেতু বলেছি, ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিভিন্ন বয়ান আছে, তাই সেদিন যা যা ঘটেছিল, তার কারণ ও দায়দায়িত্ব নিয়েও একধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি চলে। আর তাই ৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য অ্যাপলিটিক্যাল অবস্থান থেকে বুঝতে হলে, ৭ নভেম্বরের পক্ষগুলোর যার যার অবস্থান, লক্ষ্য ও তাদের কার্যক্রম বিচার করতে হবে। বাকিটা একজন সুবিবেচক ও সচেতন পাঠকই বুঝে নেবেন। আমার এই লেখায় আমি সংক্ষিপ্তভাবে চেষ্টা করব ৭ নভেম্বরে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পক্ষ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়কের অধীনে কীভাবে একে অপরকে ওভারপাওয়ার করার চেষ্টা করেছিল এবং সেনানিবাসের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলিতে কিভাবে ক্রমশ সাধারণ জনগণ জড়িয়ে গিয়েছিল এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কীভাবে জনতার নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট একটি সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে উৎখাত ও নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন সকল রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে, যাকে আমরা বাকশাল হিসেবে চিনি। স্বভাবতই, গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশী জনগণ তার এই হঠকারী সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। শুধু তাই নয়, দেশব্যাপী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপরে চালানো দমন পীড়ন, আওয়ামী লীগের নেতাদের চোরাকারবারি-মজুদদারি-লুটপাট ও ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণেও প্রেসিডেন্ট মুজিব ছিলেন সর্বতোভাবে ব্যর্থ। ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতার মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে গিয়েছিল। একটি সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক নির্বাচন হলে তখন নিশ্চিত আওয়ামী লীগের পতন হতো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মুজিব তাকে স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা থেকে হটানোর সব রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য সেনাবাহিনীর সমকক্ষ প্রতিষ্ঠান রক্ষীবাহিনী তৈরি করা হয়, যেটির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা-গুম-নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। স্বভাবতই, শেখ মুজিবুর রহমানের এই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বাকি বাংলাদেশের মতো সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও ক্ষুব্ধ ছিলেন, যাদের বড় অংশ মাত্র ৪ বছর আগে মরণপণ যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতা থেকে উৎখাত হবার পরপরই শেখ মুজিব বিরোধী বিভিন্ন পক্ষ ও সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। জনগণ দেশের প্রধান নেতার মৃত্যুতেও প্রতিবাদমুখর হয়নি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় উদযাপন করতে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বিশেষ মিত্র হাসানুল হক ইনুকেও দেখা গিয়েছিল সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কে চড়ে উৎসব করতে, এমনটাই ডকুমেন্টেড আছে। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিলেন সেনাবাহিনীর মধ্যপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা। তারা তাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের এখানে জড়াতে চাইলেও, তারা রাজি হননি। বাধ্য হয়ে তারা যোগাযোগ করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুরনো কেবিনেটের একটি বড় অংশ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়। তবে কাগজে-কলমে মোশতাক প্রেসিডেন্ট হলেও ক্ষমতার প্রকৃত নাটাই ছিল বঙ্গভবন দখল করে রাখা মেজরদের হাতে। তারা মুজিব সরকারের সময়কালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে পদ থেকে সরিয়ে দেন প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে। সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন জিয়াউর রহমান। জিয়ার জনপ্রিয়তা সেনাবাহিনীতে ছিল আকাশচুম্বী, তাই তারা জিয়াকে সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু এ মেজররা জিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, তাই তারা জিয়ার ক্ষমতাকে সীমিত করার জন্য চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ হিসেবে জেনারেল ওসমানী ও সিজিএস হিসেবে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফকে নিয়ে আসেন।
সেনাবাহিনীর মধ্যে মুজিবকে উৎখাতকারী মেজরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে আলোচনা চলছিল। অক্টোবরের শেষদিকে অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে এ মেজররা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নেন। দৃশ্যপটে তখন চলে আসে দুটি পক্ষ, একটি সিজিএস খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন শাফায়াত জামিল, এটিএম হুদা এবং তাদের অধীন ইউনিটগুলো, অন্যদিকে সেনাপ্রধান জিয়ার নেতৃত্বাধীন মীর শওকত আলী, এমএ মঞ্জুর ও নুরুল ইসলাম। এদের প্রত্যেকেই মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ছিলেন এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর সমমর্যাদায় বিশেষ বাহিনীও ছিল।
সেনাবাহিনীর বাইরে থেকে তখন ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছতে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা কর্নেল আবু তাহের। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী এ সেনা কর্মকর্তা বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং চেয়েছিলেন জিয়ার জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে।
এমতাবস্থায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন ও এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। খন্দকার মোশতাক আহমদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ও পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কারাবন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পুরোধা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন কামারুজ্জমান ও এম মনসুর আলীকে। গৃহবন্দি ও পদচ্যুত করা হয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে।
খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থানের সময়ে সেনাপ্রধান ঘোষণা করলেও, সেনাবাহিনীর ভেতর তার প্রভাব ছিল কম। সেনাবাহিনীতে জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের দিক থেকে জেনারেল জিয়া ছিলেন শীর্ষে। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান ও আবু সায়েম প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও দেশের কোথাও আওয়ামী লীগের কোনো মিছিল দেখা যায়নি। কিন্তু নভেম্বরের ৪ তারিখে, সিপিবি ও কিছু বাম দল মিছিল করে, যেখানে খালেদ মোশাররফের মা ও তার ভাই রাশেদ মোশাররফকেও দেখা যায় এবং এই মিছিলটিই খালেদ মোশাররফের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনে।
কর্নেল আবু তাহের বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, খালেদ মোশাররফ ভারতীয় চর। তখন দেশব্যাপী ভারতবিরোধী মনোভাব ছিল তুঙ্গে। শুধু তাই নয়, গুজব রটে যে এই মিছিলটিতে ভারত থেকে আসা লোকজনও ছিল।
খালেদ মোশাররফ তার সহযোগীদের সঙ্গে যে পরিকল্পনা করে অভ্যুত্থান করেন, অভ্যুত্থানের পর তার কিছুই বাস্তবায়ন করেননি। তাদের পরিকল্পনা ছিল মেজরদের বঙ্গভবন থেকে তাড়িয়ে খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা, আওয়ামী লীগকে রাস্তায় নামানো এবং সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে (আনোয়ার উল আলম) খালেদ মোশাররফ নিজেই রাষ্ট্রপতি হতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি আলাপ আলোচনা করে অনেক সময় নষ্ট করেন, আর এর মধ্যে সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনা ছিল, অভুত্থান ব্যর্থ হলে তিনি কুমিল্লার দিকে চলে যাবেন ঢাকা ত্যাগ করে। তিনি যখন সেনাবাহিনীর ভেতর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না, তখন তিনি কর্নেল হুদা ও লে. কর্নেল এটিএম হায়দারকে নিয়ে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটে চলে যান। এদিকে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সংবাদ পেয়ে, তাহের ঢাকায় চলে আসেন, গণবাহিনী ও সেনাবাহিনীর ভেতরের সংগঠিত বিপ্লবী গণবাহিনীকে সক্রিয় করেন, যারা দ্রুত বিভিন্ন ইউনিটে অফিসারদের নিরস্ত্র ও বন্দি করে ঘটনাপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এদিকে জিয়া গৃহবন্দি হলেও তার বেডরুমের ফোনের মাধ্যমে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যোগাযোগ অক্ষুণ্ন ছিল। তাহেরের পরিকল্পনা ছিল, জিয়াকে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা।
তাহের ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জিয়ার কাছে পৌঁছার আগেই, ২ ফিল্ড রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর আনিস মেজর মহিউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনেন।
৭ নভেম্বর বেলা ১১টায় ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে একটি ট্রাক এসে থামে। ট্রাকে রাখা ছিল মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার ও কর্নেল হুদার লাশ। জিয়াকে জানানো হলো, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের হাতে তারা নিহত হয়েছেন। যদিও ৭ নভেম্বর সকালে, জিয়া ১০ ইস্ট বেঙ্গলের কমান্ডারকে বলেছিলেন খালেদ মোশাররফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, কিন্তু তাহেরের নিয়ন্ত্রণাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাদের অবস্থান জেনে ফেলে ও তাদের ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে।
যখন তাহের জিয়ার সামনে পৌঁছান, ততক্ষণে জিয়া তার অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাহের জিয়াকে নিয়ে রেডিও বাংলাদেশে যেতে চান, কিন্তু জিয়া এরই মধ্যে গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অন্য অফিসারদের থেকে অবহিত হয়েছিলেন। তিনি তাহেরকে বলেন, তিনি আগেই তার ভাষণ রেকর্ড করে রেডিওতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তখন তাহের সৈনিক সংস্থা আর ১২ দফা দাবিদাওয়ার একটি কাগজ জিয়াকে দেন। জিয়া তখন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি, তাহের রুষ্ট হন ও সৈনিক সংস্থা তার পরপরই হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পরবর্তী ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টায় অন্তত ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের হাতে নিহত হন। এ ধরনের বেপরোয়া রক্তপাত দেখে সাধারণ সৈনিকেরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা থেকে দূরত্ব তৈরি করা শুরু করে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওই মুহূর্তে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে মাত্র ৪০-৫০ জন অফিসার ছিলেন, যাদের মধ্যে জিয়াও ছিলেন একজন। বিপরীতে সাধারণ সৈনিক এবং সৈনিক সংস্থার সবাই ছিল সশস্ত্র। জিয়া সৈনিকদের কাছে ডাকেন, তাদের দৃঢ়ভাবে অস্ত্র জমা দিতে বলেন এবং তাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নেয়া হবে আশ্বাস দেন। ৮ নভেম্বর সকাল থেকে জিয়া হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সারা দেশের সেনানিবাসগুলো সফর করা ও সেনাবাহিনী চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠায় তৎপর হন।
৩-৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি অনুসরণ করলে উপলব্ধি করা যায় যে এই পুরোটা সময় যা যা ঘটেছে, তা কোনো একক ব্যক্তির বা দলের নিয়ন্ত্রণে বা অঙ্গুলি হেলনে ঘটেনি। বরং সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে খালেদ মোশাররফ ও তার অনুগতরা ১৫ আগস্টের মেজরদের হটিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর বাইরে থেকে জিয়ার জনপ্রিয়তা ও তার সঙ্গে জিয়ার সম্পর্ককে পুঁজি করে কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে যেতে।
একটা কথা বহুবার শুনেছি এবং পাঠকদের শোনার কথা, যে কর্নেল তাহের জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণীতে প্রমাণিত হয় যে কর্নেল তাহের জিয়ার কাছাকাছি পৌঁছার আগেই, ২ ফিল্ড রেজিমেন্টের সুবেদার আনিস ও মেজর মহিউদ্দিন জিয়াকে উদ্ধার করে ইউনিটে নিয়ে আসেন।
৭ আগস্টের নায়ক, প্রতিনায়ক ও পার্শ্বনায়কের প্রত্যেকে মুক্তিযোদ্ধা। ৭ আগস্টে তাদের ভূমিকা যাই থাকুক, এ রাষ্ট্রগঠনে ও আমাদের অভ্যুদয়ে তাদের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। আর পরিহাসের ব্যাপার এই যে কর্নেল তাহের এবং মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ দুজনই শেখ মুজিবের ক্ষমতাচ্যুতির পক্ষে থাকলেও তাদের এ ভূমিকা অনেকেই চেপে যান।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য অনন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসে। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়া বিপ্লবের বরপুত্রে পরিণত হন, সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে শৃঙ্খলিত হতে শুরু করে ও বেসামরিক প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। দেশের স্থিতিশীলতার জিয়ার ইতিবাচক ভূমিকায় জনগণের একধরনের ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছিল, যেটি কাজে লাগিয়ে জিয়া রাজনীতিতে আসেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ক্ষমতায় আসে, জিয়া মাত্র তিন বছরে দেশের সার্বভৌমত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে যে নীতি নেন, তাতেই পরবর্তী ৫০ বছর বাংলাদেশ চলেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম চেয়েছিলেন ১৫ আগস্টের পর থেকে যে হানাহানি শুরু হয়েছিল, তাতে বাঁধ টানতে এবং ৭ নভেম্বরের শুরু থেকেই তার প্রচেষ্টা ছিল মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার ও কর্নেল হুদাকে রক্ষা করার। ১০ বেঙ্গলের অধিনায়ককে তিনি একাধিকবার নির্দেশ দেয়ার পরও, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকজন তাদের ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে। খালেদ মোশাররফকে বাঁচাতে না পারলেও, তিনি তার আরেক সহযোগী শাফায়েত জামিলকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তাঁকে বলেছিলেন, “Lets forgive and forget and reunite the army. জিয়া ইতিবাচক থাকলেও, কর্নেল তাহের, যিনি শেখ মুজিবের লাশ কেন বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলা হয়নি বলে আক্ষেপ করেছিলেন, ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়ে রক্ত গঙ্গা বইয়ে দেন এবং অন্তত ২০ জন অফিসার, লেডি ডাক্তার ও খেলোয়াড়কে হত্যা করেন। হানাহানির যে সংস্কৃতি জিয়া থামাতে চেয়েছিলেন, তা তিনি শত চেষ্টা করেও পারেনি এবং মাত্র পাঁচ বছরের কম সময়ে তাকেও শহীদ হতে হয়।
কিন্তু মৃত্যুর আগের চার বছর জিয়া বাংলাদেশের জন্য যা করে গেছেন, সে জন্য বাংলাদেশের মানুষ তার প্রেমে বুঁদ ছিল, তার শাহাদাতের পর পুরো দেশ ভেঙে পড়েছিল ঢাকায়, তাকে একনজর দেখার জন্য। শুধু তাই নয়, যে জেনারেল ওসমানী একসময় জিয়ার বিরোধী ছিলেন, জিয়ার বিপরীতে নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন, তিনিও এসে জিয়ার পতাকা জড়ানো কফিনকে স্যালুট করে তার মুগ্ধতার কথা জানান দিয়েছিলেন।
আসলাম বেগ সায়েম: জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ডায়ালগ
তথ্যসূত্র: রক্ষীবাহিনীর সত্য মিথ্যা, কর্নেল আনোয়ার উল আলম
রক্তাক্ত দিনগুলি ৭৫-৮১: অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা—এম সাখাওয়াত হোসেন
তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা: কর্নেল এমএ হামিদ
সংগ্রামের নোটবুক








