৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ দিনের সঙ্গে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে তার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে উত্থান গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের কারণে দিনটি নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়নও রয়েছে। তবে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং পরবর্তী উন্নয়নযাত্রায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা মূল্যায়নেরও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

তার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, প্রশাসন, বেসরকারি উদ্যোগ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে দেশকে উৎপাদনমুখী উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা ছিল তার রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন ও পুনঃখনন, কৃষিতে সার ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার সময়ের খাল খনন কর্মসূচি শুধু সেচের পানি সরবরাহের উদ্যোগ ছিল না; এর সঙ্গে গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যও যুক্ত ছিল। ১৯৭৬-৭৭ ও ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও কৃষি অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাতেও ১৯৭৫-৭৬ সালের পরবর্তী সময়ে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা এবং সেচ, বীজ, সার ও পানিনির্ভর প্রযুক্তির অবদান চিহ্নিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছিলেন। ধান উৎপাদন, উন্নত জাত, গবেষণা এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে এ ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তবে এ অগ্রগতি কোনো একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। কৃষক, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি খাত এবং পরবর্তী সময়ের নীতিগত ধারাবাহিকতা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে অবদান রেখেছে। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তার রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা বিস্তার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং বেসরকারি খাতের বিকাশ।

তাই জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, শিল্পে সমৃদ্ধ, অর্থনীতিতে শক্তিশালী, সামাজিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই হোক ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্যের আধুনিক মূল্যায়ন।

ড. এম মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম: কৃষিবিদ ও বীজ প্রযুক্তিবিদ