শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। রাজনৈতিক ঝড়ে বিধ্বস্ত ঢাকার আকাশ তখনো পরিষ্কার হয়নি। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানী সাক্ষী হয়েছে একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের, এক রাষ্ট্রপতির বিদায় আর আরেকজনের আকস্মিক শপথের। থমথমে শহরটা তখন ক্লান্ত, ভীত, ডালপালা ছড়ানো গুজবের ভারী চাদরে ঢাকা। সেই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ: সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। ৩ নভেম্বর থেকে তিনি সেনানিবাসে নিজের বাসভবনে গৃহবন্দি; বাইরের মানুষ জানত না তিনি কেমন আছেন, কী অপেক্ষা করছে তার জন্য।
সেনানিবাসের রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় কাটল সেই দীর্ঘ রাত। মধ্যরাতের পর সিপাহিরা ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে এল, বন্দি জিয়াকে মুক্ত করে কাঁধে তুলে নিল। ভোরের আলো ফুটতেই সৈনিকদের পাশে রাস্তায় নেমে এল সাধারণ মানুষও। সেই ভোরে রেডিও বাংলাদেশের মাইক্রোফোন থেকে ভেসে এল সদ্য মুক্ত মানুষটির চেনা কণ্ঠস্বর: ‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’
মানুষের হৃৎস্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হলো পরিচিত এক সুর। সাড়ে চার বছর আগে একাত্তরের মার্চের সেই রক্তঝরা শেষ সপ্তাহে, ঢাকার বেতার যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে আর শহরে চলছে গণহত্যা, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এ কণ্ঠই উচ্চারণ করেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। সেদিন তিনি ছিলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩৫ বছরের এক তরুণ মেজর, এক বিদ্রোহী সৈনিক। পঁচাত্তরের নভেম্বরে তার বয়স ৩৯, কাঁধে মেজর জেনারেলের তারকা, আর তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন রাষ্ট্রের নিজস্ব বেতার থেকে। কণ্ঠ একই, কিন্তু বদলে গেছে সময় ও প্রেক্ষাপট।
সেদিন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় জিয়ার ছবির নিচে বড় হরফে লেখা ছিল শুধু: ‘আমি জিয়া বলছি’। ভাষণে তিনি নিজেকে মেজর জেনারেল বলেছিলেন, কিন্তু শিরোনামে পদবিটা ঝরে পড়ল। কে জানে, সম্পাদক কী জানতেন, এ ছোট্ট বাদ দেয়াতেই এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যাবে দুই ভোর? এ লেখা সেই সুতো ধরেই খোঁজে, জাতির দুই সংকটে মানুষ কেন একই কণ্ঠের দিকে তাকিয়ে ছিল।
পঁচাত্তরের নভেম্বর হঠাৎ আসেনি; এর শিকড় স্বাধীনতার পরের সাড়ে তিন বছরে প্রোথিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি সামলানো সহজ ছিল না, কিন্তু সংকটকে অসহনীয় করে তুলেছিল শেখ মুজিবের সরকারের নিজস্ব ব্যর্থতা। রিলিফের কম্বল থেকে বাণিজ্যের লাইসেন্স পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল লুটপাট আর দলীয় ক্যাডারদের দাপট; খোদ শেখ মুজিবও প্রকাশ্য ভাষণে দুর্নীতিবাজদের নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন। সে ব্যর্থতার সবচেয়ে মর্মান্তিক দলিল চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, যাতে কত মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিল, তার হিসাব আজও মেলেনি।
আইন-শৃঙ্খলার চিত্রটিও ছিল ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির মতো সংগঠনগুলো তখন সহিংস পথে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে; থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট আর গুপ্তহত্যা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল রক্ষীবাহিনী, যার বিরুদ্ধে বিনা বিচারে হত্যা ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। চুয়াত্তরে এল বিশেষ ক্ষমতা আইন, আর বছরের শেষ প্রান্তে জারি হলো জরুরি অবস্থা। পঁচাত্তরের জানুয়ারির শুরুতে পুলিশ হেফাজতে নিহত হলেন সর্বহারা পার্টির শীর্ষনেতা সিরাজ সিকদার।
পুঞ্জীভূত এ সংকটের জবাব সরকার খুঁজেছিল আরো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হাতে নিয়ে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ কার্যত কোনো বিতর্ক ছাড়াই পাস করল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্জিত সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌধ ভেঙে প্রবর্তিত হলো একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। ফেব্রুয়ারিতে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে অন্যসব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ হলো; আর জুনে সরকার নিয়ন্ত্রিত মাত্র চারটি দৈনিক ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্রের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়া হলো। যে দল ও যে নেতা একসময় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দাবিতে বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন, পরিহাসের বিষয় তাদের হাতেই রুদ্ধ হয়ে গেল বিরোধী মতপ্রকাশের শেষ দরজাও।
সমর্থকেরা এ আমূল পরিবর্তনের নাম দিয়েছিলেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’, শোষণমুক্ত একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়, সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ হয় আর সংসদ প্রাণহীন হয়ে পড়ে, তখন মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের সব বৈধ ও শান্তিপূর্ণ পথ রুদ্ধ হয়ে যায়; সে শূন্যতা থেকেই বন্দুক হয়ে ওঠে ক্ষমতার পালাবদলের ভাষা। পঁচাত্তরের রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে হলে এ রুদ্ধদ্বার শূন্যতাকেই আগে চিনতে হবে।
তারপর এল ১৫ আগস্ট। ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিল সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, আর ক্ষমতার মসনদে বসলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। পরদিন দ্য বাংলাদেশ অবজারভারের প্রথম পাতার শিরোনাম: ‘MUJIB KILLED : SITUATION REMAINS CALM’। আর দ্য বাংলাদেশ টাইমস প্রথম পাতার সম্পাদকীয় মন্তব্যের শিরোনাম দিল: ‘ON THE THRESHOLD OF A NEW ERA’।
এ গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার নিচে চাপা পড়ে ছিল আরেক বারুদ—সেনাবাহিনীর ভেতরের ক্ষোভ। মুক্তিযুদ্ধ করে আসা সৈনিক আর পাকিস্তান থেকে ফেরা সদস্যদের মধ্যে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে টানাপড়েন কখনো মেটেনি। রক্ষীবাহিনীকে দেয়া বিশেষ প্রাধান্য অনেকের চোখে ছিল অবমাননাকর। আর সাধারণ সিপাহির জীবনে ছিল সামান্য বেতন, নিম্নমানের রসদ আর অফিসারের ফাইফরমাশ খাটার ‘ব্যাটম্যান’ প্রথার অপমান।
১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ল। অভ্যুত্থান ঘটানো কয়েকজন মেজর বঙ্গভবনে বসে কলকাঠি নাড়ছিলেন, জ্যেষ্ঠ জেনারেলদের পাত্তাই দিচ্ছিলেন না। চেইন অব কমান্ড ফেরানোর কথা বলে ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটালেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। কিন্তু ফল হলো উল্টো। বঙ্গভবনের মেজরেরা দরকষাকষি করে নিরাপদে দেশ ছাড়লেন, আর সেনাপ্রধান জিয়া হলেন গৃহবন্দি। এরপর তিনদিন কেউ জানত না রাষ্ট্রের চাবিকাঠি আসলে কার হাতে।
দুদিন পর সরকারি কাগজ জানাল, জিয়া নাকি ‘পদত্যাগ করেছেন’। কিন্তু চারদিন ঘুরতেই আরেকটি দৈনিকের পাতায় বেরিয়ে এল আসল সত্য, তিনি পদত্যাগ করেননি, ছিলেন অবরুদ্ধ ও আটক।
৪ নভেম্বর ঢাকার রাজপথে বের হলো একটি মিছিল, আর সৈনিকদের সঙ্গে শহরের বহু মানুষের মনেও জাগল এক পুরনো আশঙ্কা: দেশ কি আবার ভিনদেশী প্রভাবের ছায়ায় ঢুকে পড়ছে? মুহূর্তে ব্যারাক থেকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ল কথা—খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী, তার হাত ধরে বিপন্ন হতে চলেছে দেশের সার্বভৌমত্ব। কথাটা কতটা সত্য, তা নিয়ে পরে বহু তর্ক হয়েছে; কিন্তু সিপাহি আর জনতার কাছে তখন সেটাই ছিল সত্য। সে আশঙ্কার মুহূর্তে সবার চোখ ফিরল একজন মানুষের দিকে—গৃহবন্দি জিয়া, যিনি একাত্তরে কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, যিনি রাজনীতির বাইরের এক খাঁটি সৈনিক, আর যাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

৬ নভেম্বরের ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পেরোতেই সেনানিবাসের বুক চিরে দানা বাঁধল সিপাহি বিদ্রোহ। রাত ১টার দিকে ব্যারাকের নীরবতা ভেঙে বেরিয়ে এল অজস্র সৈনিক, চোখের নিমেষে খুলে নেয়া হলো অস্ত্রাগারের কপাট। পুবাকাশ ফর্সা হওয়ার আগেই তারা গৃহবন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে নিয়ে এল দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির প্রাঙ্গণে; ফুলের মালায় ঢেকে গেল তার অবয়ব, অথচ শরীরে তখনো রাতের পোশাক।
৭ নভেম্বরের সকালে ঢাকার রাজপথ যেন উৎসবের ক্যানভাস। শহরের প্রধান সড়কগুলো তখন ট্রাক আর ট্যাংকে বসা উচ্ছ্বসিত সৈনিক আর তাদের পাশে পা মেলানো সাধারণ মানুষের স্রোতে একাকার; সবার কণ্ঠে এক স্লোগান: ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’। পরদিনের দৈনিক বাংলা লিখল, ‘আনন্দ উদ্বেল মানুষের এক অভূতপূর্ব জোয়ার নেমেছিল গতকালের ঢাকায়।’ দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করল ‘প্রাণবন্যায় উচ্ছল নগরী’; ছবির ক্যাপশনে সাঁজোয়া গাড়ির সিপাহিদের উদ্দেশে ‘উৎফুল্ল জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন’।
বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজের পর বের হলো বিশাল মিছিল, যার স্লোগানে একসঙ্গে উচ্চারিত হলো জিয়াউর রহমানের নাম। মসজিদে মসজিদে মোনাজাত হলো। দ্য বাংলাদেশ অবজারভার সেদিনের সম্পাদকীয়তে জনতার এ স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসকে তুলনা করল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়-উল্লাসের সঙ্গে।
সেদিনের উল্লাস কোনো সাজানো নাটক ছিল না; দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর মানুষ যেন অবশেষে একটি ভরসার মুখ খুঁজে পেয়েছিল। সেদিন বিকালে জাতির উদ্দেশে দেয়া দ্বিতীয় ভাষণে জিয়া অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া সৈনিকদের অভিনন্দন জানালেন, একই সঙ্গে অনুরোধ করলেন ‘স্ব স্ব কর্তব্যস্থলে প্রত্যাবর্তনের’। যে সৈনিকেরা তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিল, তাদের সুশৃঙ্খলভাবে ব্যারাকে ফেরানোই হয়ে দাঁড়াল তার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। পরের দিনগুলোয় তিনি নিজে ব্যারাকেই রাত কাটিয়েছেন, প্রাণভয়ে পালিয়ে যাওয়া অফিসারদের ফিরিয়ে এনে একটু একটু করে জোড়া লাগিয়েছেন চেইন অব কমান্ডের ভাঙা শিকল।
৭ নভেম্বরকে স্মৃতিতে বাঁধার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল ঠিক পরদিনই। ৮ নভেম্বর ইংরেজি দৈনিক দ্য বাংলাদেশ টাইমস প্রথম পাতায় ‘Bangladesh Wins Freedom’ শিরোনামে মন্তব্য ছাপল। সেখানে লেখা হলো: ‘Bangladesh thus stands liberated as of this day after a long-drawn-out struggle that was sparked off by the historic call of General Ziaur Rahman on the morrow of March 25, 1971.’ অর্থাৎ একাত্তর আর পঁচাত্তরকে এক সুতোয় গাঁথার এ বয়ান পরবর্তীকালের কোনো দলীয় প্রচারের আবিষ্কার নয়; এর জন্ম ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই।
কেন এই দিনের নাম ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’? নামের তিনটি শব্দেই ধরা আছে সেদিনের তিনটি সত্য। প্রথম শব্দ বিপ্লব। ৭ নভেম্বর কয়েকজন অফিসারের গোপন পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ কোনো অভ্যুত্থান ছিল না। সাধারণ সিপাহিরা ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল, আর রাজপথে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল জনতা। সেদিনের দৈনিক বাংলা প্রধান শিরোনামেই একে বলেছিল ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব’। দ্বিতীয় শব্দ সংহতি। যে সেনাবাহিনী তিন মাসের মধ্যে অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছিল, আর যে জাতি তার দিকে তাকিয়ে ছিল ভয় ও সন্দেহের চোখে, সেদিন সেই সৈনিক আর সাধারণ মানুষ ট্যাংকের ওপরে, রাজপথে একসঙ্গে উল্লাস করেছে। সৈনিক আর জনতার এ মিলন, আর তার ভেতর দিয়ে ভাঙা চেইন অব কমান্ড জোড়া লাগার সূচনা, এটাই সংহতি। অবজারভারের সম্পাদকীয় সেদিনই মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে চিহ্নিত করেছিল স্থিতি ও সংহতির প্রত্যাশা হিসেবে। তৃতীয় শব্দ জাতীয়। সেদিনের দৈনিক বাংলার প্রধান শিরোনামের মাথায় লেখা ছিল ‘আমাদের স্বাধীনতা রাখবোই রাখবো’। এ ঐক্য কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর ছিল না; বহু মানুষের চোখে এটি ছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গোটা জাতির জেগে ওঠা। তাই দিনটির নাম কেবল একটি সামরিক ঘটনার স্মারক নয়; এটি সেই মুহূর্তের নাম, যখন বিভক্ত সৈনিক আর দিশাহারা জনতা এক কাতারে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে স্থির করার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল জিয়াউর রহমানের হাতে।
৭ নভেম্বরের পর জিয়ার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করানো। ঘটনার তিনদিন পরও ঢাকায় কারফিউ, সভা-মিছিল নিষিদ্ধ, কাগজে সরকারি বিজ্ঞপ্তি: ‘গুজবে কান দিবেন না’। সেনাবাহিনীর ভেতরে তখনো অস্থিরতা; পরের কয়েক বছরে একের পর এক বিদ্রোহ আর অভ্যুত্থান-চেষ্টা সামলাতে হয়েছে তাকে। ধৈর্য আর দৃঢ়তায় তিনি সেই ভাঙা সেনাবাহিনীকে আবার চেইন অব কমান্ডের শৃঙ্খলায় বাঁধলেন। প্রশাসন আবার সচল হলো, আর দীর্ঘ অস্থিরতার পর দেশ পেল স্থিতির ভিত।
কিন্তু জিয়া জানতেন, কেবল শৃঙ্খলা দিয়ে রাষ্ট্র চলে না; চাই জনগণের অংশগ্রহণ। তাই উর্দি পরা অবস্থাতেই তিনি হাঁটলেন রাজনীতি ফিরিয়ে আনার পথে। ১৯৭৬ সালে জারি হলো রাজনৈতিক দল বিধি, আর দেড় বছর ধরে নিষিদ্ধ থাকা দলগুলো আবার প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পেল। বাকশালে বিলীন হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগও নতুন করে নিবন্ধিত হয়ে রাজনীতিতে ফিরল। বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক সংবাদপত্র ধীরে ধীরে আবার প্রকাশের মুখ দেখল।
১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জিয়া জাতির সামনে রাখলেন ১৯ দফা কর্মসূচি, আর নিজের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা যাচাইয়ে আয়োজন করলেন গণভোটের। ১৯৭৮ সালের জুনে দেশের প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি মুখোমুখি হলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর, যার পেছনে ছিল আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর জোট। জনগণের রায়ে জয়ী হলেন জিয়া। সে বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। একজন সেনানায়ক সেনানিবাসের নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে নেমে এলেন ভোটের মাঠে; দল গড়লেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রকাশ্যে লড়লেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ছিল সেই যাত্রার মাইলফলক। আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, জাসদসহ দুই ডজনেরও বেশি দল সেই নির্বাচনে অংশ নিল। বিএনপি পেল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন, আর আওয়ামী লীগ বসল বিরোধী দলের আসনে। সংসদ বসার পর পরই প্রত্যাহার করা হলো সামরিক আইন। যে দেশে চার বছর আগে একটিমাত্র দল ছাড়া সব রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে আবার ফিরল বহুদলীয় সংসদ, ফিরল সরকারি দল আর বিরোধী দলের বিতর্ক। এ কারণেই বিএনপি জিয়াউর রহমানকে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক’ বলে, এ দাবির পক্ষে ইতিহাসের সাক্ষ্য জোরালো।
সময়টাকে বাইরে থেকে দেখলে এ অর্জনের ওজন আরো বোঝা যায়। সত্তরের দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর বড় অংশ হেঁটেছিল উল্টো পথে। তানজানিয়া আর জাম্বিয়ায় একদলীয় শাসন টিকে ছিল নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত। ঘানায় একদলীয় শাসনের অবসান হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থানে, তারপর দেশটি আটকে পড়েছিল একের পর এক অভ্যুত্থানের চক্রে। সে সময়ে বাংলাদেশে একজন সামরিক নেতা নিজেই দল আর নির্বাচনের পথ খুলে দিলেন, চার বছরের মাথায় সংসদ ফিরিয়ে আনলেন, সামরিক আইন তুলে নিলেন। শীতল যুদ্ধের সেই অস্থির পৃথিবীতে এমন উত্তরণ ছিল বিরল।
রাষ্ট্রনায়ক জিয়াকে শুধু রাজনৈতিক কাঠামো দিয়েও মাপা যায় না। তার বিপুল জনপ্রিয়তার মূল উৎস ছিল তার অনন্য ব্যক্তিত্ব, আর এ দাবির পক্ষে সাক্ষ্যও নেহাত কম নয়। সহকর্মী সামরিক কর্মকর্তা থেকে বিদেশী সাংবাদিক, অনেকের স্মৃতিতে তিনি এক স্বল্পভাষী, হাড়ভাঙা পরিশ্রমী ও কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ। বাহাত্তরে জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সেনাপ্রধানের পদ না পেয়ে তিনি উপপ্রধানের পদ মেনে নিয়েছিলেন, কোনো ক্ষোভ দেখাননি; সাধারণ সিপাহিদের চোখে সেই সংযম তাকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। তার কট্টর সমালোচকেরাও তার ব্যক্তিগত সততার ওপর খুব একটা দাগ ফেলতে পারেননি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি নাগরিক কোলাহল ছেড়ে বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। নিজ হাতে কোদাল ধরে খাল খনন কর্মসূচিতে নেমেছেন; স্বনির্ভর আন্দোলন আর গ্রাম সরকারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন মানুষের দোরগোড়ায়। আর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা দিয়ে তিনি এমন এক রাজনৈতিক পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের সঙ্গে এ দেশের মানুষের ধর্মীয় ও ভৌগোলিক আত্মপরিচয়কে এক সুতোয় বাঁধে।
ইতিহাসের ক্যানভাসে দুই ভোরকে পাশাপাশি রাখলে একটি মিল উজ্জ্বল হয়ে ওঠে: দুবারই জাতি দাঁড়িয়ে ছিল অস্তিত্বের সংকটের কিনারে, আর দুবারই অন্ধকার ভেদ করে ভেসে এসেছিল একই কণ্ঠ। একাত্তরের মার্চে, যখন ঢাকা গণহত্যায় স্তব্ধ আর নেতৃত্ব দিশাহারা মানুষের নাগালের বাইরে, সেই কণ্ঠ এনেছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে নামার ডাক। পঁচাত্তরের নভেম্বরে, যখন অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার মুখে, বহু মানুষের কাছে সেই কণ্ঠই হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা রক্ষার আশ্বাস। প্রথমবার তিনি ছিলেন এক বিদ্রোহী মেজর, দ্বিতীয়বার সেনাপ্রধান; কিন্তু দুবারই সংকটের মুহূর্তে মানুষ যেন তার কণ্ঠের অপেক্ষায়ই ছিল। দৈনিক বাংলার সম্পাদক হয়তো সেটাই বুঝেছিলেন, তাই শিরোনাম থেকে পদবিটুকু বাদ দিয়ে দুই ভোরকে এক কণ্ঠে বেঁধে দিয়েছিলেন। ইতিহাস হয়তো কোনো একক কণ্ঠে তৈরি হয় না; কিন্তু দুই সংকটের দুই ভোরে মানুষ যে কণ্ঠের অপেক্ষায় ছিল, সেটি একই মানুষের কণ্ঠ ছিল। এ সত্যটুকুই জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আলাদা করে রেখেছে।
আবুল বাশার নাহিদ: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়









