সদ্য শেষ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন রুটিন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি ছিল আমেরিকান গণতন্ত্রের আত্মার ওপর একটি গণভোট। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলনের বিভাজনমূলক রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান ছিল এ ফলাফল। এটা শুধু ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য একটি বিজয় ছিল না, বরং ছিল আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতার একটি জোরালো নিশ্চিতকরণ। আমাদের মতো দেশে যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রায়ই ভঙ্গুর ও বিতর্কিত আদর্শ, সেখানে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন আমাদের সামনে একটি নির্মম, অমূল্য এবং সম্ভবত অস্বস্তিকর আয়না তুলে ধরে। ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেকটা ব্যক্তিগত গণভোটে পরিণত করেছিলেন কিন্তু তার বিরুদ্ধেই স্পষ্ট রায় এসেছে। ব্যক্তিত্বের অন্ধ উপাসনার প্রত্যাখ্যান এবং জবাবদিহিতার প্রতি প্রত্যাবর্তন এ মধ্যবর্তী নির্বাচনের বার্তা।

এ আমেরিকান রাজনৈতিক নাটক থেকে মূল শিক্ষাটি নির্দিষ্ট কোনো নীতিগত জয় বা পরাজয়ে নয়, বরং ক্ষমতার কার্যপ্রণালির মধ্যে নিহিত। মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রমাণ করেছে একটি কার্যকর গণতন্ত্রে, ব্যালট বাক্স জবাবদিহিতার শক্তিশালী হাতিয়ার এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ মাধ্যম। এ বাস্তবতা বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতের মতো দেশগুলোয় প্রায় একটি স্বপ্নের মতো। এখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রায়ই বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকে এবং যেখানে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ প্রায়ই কণ্টকাকীর্ণ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান হলো সেই গভীর অসন্তোষের এক হৃদয়বিদারক স্মারক।

আমেরিকান ব্যবস্থা, তার সব ত্রুটি এবং মেরুকরণমূলক বাগ্মিতা সত্ত্বেও নিয়মতান্ত্রিকতায় মজবুত প্রমাণিত হয়েছে। ভোটাররা কথা বলেছেন এবং রাষ্ট্রের কলকব্জা, স্থানীয় নির্বাচনী বোর্ড থেকে আদালত পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে যে রায়টি শোনা এবং সম্মানিত হয়েছে। এটি হলো গণতন্ত্রের সেই নীরব, অপরিহার্য লৌকিকতা, যা আধা গণতান্ত্রিক বিশ্বে প্রায়ই অনুপস্থিত।

অধিকন্তু, আমেরিকান মধ্যবর্তী নির্বাচন শাসন সম্পর্কে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন বার্তা দিয়েছে—একটি সরকার তার জনগণের অর্থনৈতিক কল্যাণ উপেক্ষা করতে পারে, তবে নিছক নিজের ঝুঁকিতে। বাইডেন প্রশাসনের আইনগত সফলতাগুলো মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মজীবী পরিবারগুলোর অব্যাহত উদ্বেগের কারণে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে পারেনি। নির্বাচনটি ছিল একটি জোরালো স্মারক যে রাজনৈতিক পুঁজি সীমিত এবং ভোটারদের ধৈর্যও। যে সরকার তাদের নাগরিকদের দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে—খাদ্যের দাম, বাসস্থানের ব্যয়, চাকরির নিরাপত্তা—তারা তা করে নিজেদের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে। এ দৃশ্যপট বাংলাদেশের জন্য অপরিসীম প্রাসঙ্গিকতা বহন করে, যেখানে যেকোনো সরকারকে, তার ম্যান্ডেট যা-ই হোক না কেন, তার জনগণের অর্থনৈতিক চাপ সম্পর্কে তীব্র সচেতনতার সঙ্গে শাসন করার বিকল্প নেই। জনগণের ধৈর্য সীমিত এবং শাসনের ম্যান্ডেট হলো আমানত, যা প্রতিক্রিয়াশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে ক্রমাগত অর্জন ও নবায়ন করতে হবে।

আমেরিকান রাজনৈতিক ভূদৃশ্য থেকে একটি আরো সূক্ষ্ম, তবে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। মধ্যবর্তী নির্বাচন রিপাবলিকান বয়ানের একটি ক্রমবর্ধমান অসংগতি উন্মোচন করেছে, যা বিশ্বব্যাপী জনগণের সঙ্গ অনুরণিত হয়। অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষায় নিজের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার পরিণতি দেখা গেছে ফলাফলে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইসরায়েলের স্বার্থ সুরক্ষায় লড়ছে তখন মার্কিনরা নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের জন্য এ দৃশ্যপট একটি সতর্কতামূলক বার্তা। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো তার নিজের জনগণের অনুভূত স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়ে যদি ভিন্ন কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক ফাঁদে পড়ে তখন তা বৈধতার ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। এতে জনগণের আস্থা মৌলিকভাবে ক্ষয় করতে পারে।

সবশেষে মধ্যবর্তী নির্বাচন ক্ষমতার প্রকৃতি সম্পর্কে একটি চিরন্তন শিক্ষা দিয়েছে। ইতিহাস এমন উদাহরণে পূর্ণ, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একটি বিশাল ম্যান্ডেট জয়ের পর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে সেই ভোটারদের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যারা তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। আমেরিকান জিওপির স্বাধীন ও মধ্যপন্থী ভোটারদের হারানো ছিল তার চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার এবং ২০২০ সালের নির্বাচন পুনরায় বিচারের আপাত আবেশের সরাসরি ফলাফল ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। যেকোনো শাসক দলের জন্য অনুভূতিহীন ও আত্মতুষ্ট হয়ে পড়া এবং তাদের ম্যান্ডেটকে হালকাভাবে নেয়ার এ প্রবণতা একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক সত্য। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি শুধু সম্ভাবনা নয়, বরং অনুমেয় প্যাটার্ন। প্রতিটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায়ই ক্ষমতা একচেটিয়া করার উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রদর্শন করে। জিরো-সাম রাজনৈতিক খেলা শুরু করে, বিরোধী দমনের নীতি নেয় এবং সরকারের পুরো ক্ষমতা শাসনকে স্থায়ী করতে ব্যবহার করে। মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচন সরকারকে তার পলিসি ও অভিমুখ সংশোধনে বাধ্য করে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের এমন ব্যবস্থার অভাব অনেক আধা গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় চ্যালেঞ্জ।

আমেরিকান মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই শুধু একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গল্প নয়। তারা একটি বৈশ্বিক কেস স্টাডি। তারা প্রমাণ করে একটি জাতির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অঙ্গীকার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণই তার রেজিলিয়েন্সের (টেকসই) চূড়ান্ত নিশ্চয়তা।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এর অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাসে অপচয় করেছে। তারা ধারাবাহিকভাবে জনগণের স্বার্থ, কল্যাণ ও আকাঙ্ক্ষাকে সিরিয়াসলি নেয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন ও তার পার্টির এ নির্বাচনী ভরাডুবি থেকে শেখার আছে, যদি আমরা শিখতে চাই। সে শিক্ষার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়াকে সততা, বিশ্বস্ততা এবং শুদ্ধতাকে সমুন্নত রাখা ও রাখতে পারা।

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি