দেশের হাজার হাজার নারী প্রতি বছর জীবিকা উপার্জনের লক্ষ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৫৩ হাজারের বেশি নারী কাজের জন্য বিদেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশের প্রধান গন্তব্যই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ-সৌদি আরব, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও লেবানন। উল্লেখ্য, একটা সময় বছরে লক্ষাধিক নারী জীবিকার সন্ধানে বিদেশে গিয়েছেন। কিন্তু ক্রমেই সে সংখ্যা কমছে। এর অন্যতম কারণ হলো অনিরাপদ কর্মস্থল।
বিদেশের কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা, পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, এমনকি যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং এসব অভিযোগ বেড়ে চলেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬৫ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ১৭০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ১১২ জনই সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন, যা মোট আত্মহত্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের প্রাধান্য পাওয়া গেছে। আবার এর বাইরে অধিকাংশ মরদেহের সঙ্গে পাঠানো মৃত্যুসনদে কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক’ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে অনেকের শরীরে বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়, যা দেখে মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বজনদের মনে সন্দেহও জাগে। কিন্তু অসচেতনতা, আর্থিক অসচ্ছলতাসহ বহু কারণে তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে পারে না। আবার রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়, এক দেশে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের বিশেষ চেষ্টা যেমন নেই, তেমনি নারীদের জন্য নিরাপদ বৈদেশিক শ্রমবাজারের উদ্যোগেও ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে নিরাপদ বৈদেশিক কর্মস্থল বা নারীদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন কোনোটিই হচ্ছে না। যদি তারা আত্মহত্যাই করে থাকেন তাহলে কেনইবা একটি দেশে যাওয়া বিপুলসংখ্যক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, সেগুলো জানা জরুরি। নিরাপদ কাজের অধিকার সবার রয়েছে।
অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণায়ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ নিয়ে গুরুতর অসংগতি উঠে এসেছে। ২০১৭-২২ সাল পর্যন্ত দেশে ফেরা ৭০৫ নারী কর্মীর মধ্যে ১১০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়। গবেষণার অংশ হিসেবে মৃত ১০০ নারী কর্মীর পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখা যায়, ১১টি পরিবার মৃত্যুসনদে উল্লেখিত আত্মহত্যার কারণ বিশ্বাস করেনি। এসব পরিবার দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের আবেদন করলেও তা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। একইভাবে মৃত্যুসনদে ৬৯ শতাংশ নারী কর্মীর মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক উল্লেখ করা হলেও সাক্ষাৎকার দেয়া পরিবারের ৪৮ শতাংশই তা বিশ্বাস করেনি। অর্থাৎ মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের বিদ্যমান প্রক্রিয়ার ওপর স্বজনদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
বিদেশে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। জার্মানিতে বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরিয়ে আনা ১৫১টি মরদেহের ময়নাতদন্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের মৃত্যুসনদে উল্লেখিত কারণের সঙ্গে জার্মানিতে করা ময়নাতদন্তের ফলের অমিল রয়েছে। ফলে বিদেশে করা ময়নাতদন্ত বা মৃত্যুসনদকে চূড়ান্ত ধরে নেয়ার পরিবর্তে সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং সম্ভাব্য অপরাধের আলামত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
এক্ষেত্রে বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের পর সুরতহাল ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। মরদেহের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন, মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে অসংগতি কিংবা পরিবারের পক্ষ থেকে আপত্তি থাকলে বাধ্যতামূলক পুনরায় ময়নাতদন্তের বিধান করা যেতে পারে। এজন্য বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত হিমঘর, প্রশিক্ষিত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বজনদের অংশগ্রহণ, তদন্তের ফল জানানো এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
বিদেশে নারী কর্মীদের সুরক্ষায় কেবল মৃত্যুর পর তদন্তের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। নিয়োগের আগে কর্মপরিবেশ ও নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাই, চুক্তির শর্ত সম্পর্কে কর্মীদের সচেতনতা, দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ এবং নির্যাতনের অভিযোগ পেলে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগকর্তার বাড়িতে আটকে রাখা, শারীরিক নির্যাতন কিংবা যৌন হয়রানির অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলা করা রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
বিদেশে নারী কর্মীদের অভিবাসন কমে যাওয়ার পেছনে নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই নারী অভিবাসনের বাজার সম্প্রসারণ করতে চাইলে সবার আগে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে।










