সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। এতে নতুন সম্ভাবনা যেমন উন্মোচন হবে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে রফতানি খাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় বাংলাদেশ বিভিন্ন শুল্ক বাণিজ্য সুবিধা পায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা, চীন ও ভারতে এসব সুবিধা রয়েছে। ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশের এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। সম্প্রতি আরো একটি প্রতিবন্ধকতার কথা শোনা যাচ্ছে। তা হলো, পণ্যে মেড ইন বাংলাদেশ লিখতে ও শুল্ক সুবিধা পেতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ হতে হবে, বর্তমানে যা ৩০ শতাংশ হলেই চলে। পোশাকশিল্প নির্ভর রফতানি খাতের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ বটে। এটি মোকাবেলায় স্থানীয় মূল্য সংযোজন বেশি এমন শিল্প সম্প্রসারণে দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের নীতিসহায়তা প্রদানের জন্য শুল্ক ও প্রণোদনা কাঠামোর সংস্কারও প্রয়োজন।
শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণেই বাংলাদেশের রফতানি খাত বিশেষ করে পোশাক শিল্প আজ সুদৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর পোশাক খাতই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশকে প্রস্তুত হতে হবে। শ্রম পরিবেশের উন্নতি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার সূচকে উন্নতিসহ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্যময়তা বাড়াতে হবে। উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্য তেমন একটা রফতানি হয় না বললেই চলে। এর পেছনে অন্যতম কারণ দক্ষতার অভাব। রফতানি সম্প্রসারণ ও বহুমুখীকরণের জন্য তাই একটা কার্যকর কৌশল হতে পারে সেক্টরভিত্তিক জনশক্তি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা। এক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও ক্রমপরিবর্তনশীল বাজার চাহিদার সঙ্গে মিল রেখেই বাড়াতে হবে সক্ষমতা। এছাড়া পোশাক শিল্পের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট, হালকা প্রকৌশল পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য প্রভৃতি শিল্পের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্য রফতানি করার মাধ্যমে রফতানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পাটের ১০০ শতাংশই স্থানীয় মূল্য সংযোজন হয়। হালকা প্রকৌশল শিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনাও কম নয়। এছাড়া ওষুধ শিল্প এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে গেলেও ডব্লিউটিওর বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা সম্পদ অধিকার (ট্রিপস) চুক্তি পরিপালনের বাধ্যবাধকতা থেকে অন্যান্য এলডিসির মতো যেন ২০৩৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহতি পেতে পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মেধাস্বত্বের ব্যাপারেও আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও জনশক্তির দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ওষুধ শিল্পে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে এপিআই পার্ক নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের অর্থনীতি সমসাময়িক সময়ে যাত্রা করলেও আজ ভিয়েতনামের রফতানি আয় বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বর্তমানে ভিয়েতনাম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন রফতানিকারক। স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক সেলফোনের ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে ভিয়েতনাম এবং প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক জনবলের প্রায় ৩৫ শতাংশই ভিয়েতনামে। স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সস্তা জনশক্তির প্রাচুর্য, আমদানি অংশীদার দেশের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য প্রভৃতি কারণকে ভিয়েতনামের এ সাফল্যের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। সঙ্গে আছে গবেষণা, উন্নয়ন কার্যক্রমসহ আরো অনেক আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠান। স্যামসাংয়ের পাশাপাশি এলজি, ক্যানন, প্যানাসনিক ও কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারারও রয়েছে। বাংলাদেশও বিখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকর্ষণের মাধ্যমে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তরের কার্যক্রমও ত্বরান্বিত করতে পারে। এছাড়া বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন পণ্যে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উন্মোচন হয়। স্থানীয় মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে জাপান, কোরিয়া ও চীন মডেল হতে পারে। দেশটি তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষুদ্র পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দেশগুলোর গ্রামের ছোট ঘরেও বৃহৎ শিল্প পণ্যের কোনো না কোনো অংশ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের তালিকা তৈরি ও তাদের সম্প্রসারণে প্রণোদনা দিতে হবে।
রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে ও অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য রফতানি বাড়াতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে প্রণোদনা কাঠামোয় কিছু পরিবর্তনও আনা হয়েছে। এলডিসি উত্তরণের ‘পলিসি মোট্রিকস ফর কোপিং আপ উইথ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ নামে একটি সুপারিশমালা দিয়েছে জিইডি। এর মধ্যে রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি, শিল্প ও বাণিজ্যনীতি, অবকাঠামো খাত উন্নয়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মতো কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি দুটি সভা করেছে। এ সভায় ছয়টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব উপকমিটির কার্যক্রম অগ্রগতি নিয়ে আজ প্রথম পর্যালোচনা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উপকমিটিগুলো হচ্ছে বাজার প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্য চুক্তি, মেধাস্বত্ব অধিকার, বিশ্ববাণিজ্য-সংক্রান্ত ইস্যু, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, বাজার উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও ট্যারিফ সামঞ্জস্য। এসব কমিটিকে দ্রুত সচল ও কার্যকর করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে সম্প্রতি বেশকিছু সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে আরো ব্যাপকভাবে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। সহজে ব্যবসা সূচক বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে আমাদের অবস্থান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশে করপোরেট ট্যাক্সের হার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। অবকাঠামোগত দুর্বলতা তো আছেই। সব মিলিয়ে সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে, উন্নত করতে হবে অবকাঠামো। গড়ে তুলতে হবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, কমাতে হবে ব্যবসার ব্যয়। উত্তরণকালীন কার্যকর কৌশল প্রণয়নে এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও জনশক্তির উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশ যথাযথ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, জনশক্তি দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশ ও কর্মীবান্ধব শিল্পায়নে সচেষ্ট হওয়া।










