দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক মানুষকেই এখন পুষ্টিকর খাবার পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কারণ তাদের খাবারের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত, পরিশোধিত, চিনি ও চর্বিযুক্ত খাদ্য; যা গ্রহণের ফলে তাদের বেশির ভাগই অপুষ্টি ও স্থূলতার শিকার হচ্ছে। আমরা যাকে বলি ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা ‘অদৃশ্য ক্ষুধায়’ ভুগছে। তবে তাদের অদৃশ্য ক্ষুধার বিষয়টি কিন্তু দুর্ভিক্ষকালীন মিডিয়া কর্তৃক সৃষ্ট ক্ষুধাবিষয়ক গত্বাঁধা দৃশ্যের মতো নয়। এটা বরং অন্যরকম। 

আরো স্পষ্ট করে বললে, সমস্যাটি খাদ্যের অভাববিষয়ক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের অদৃশ্য ক্ষুধাটা হচ্ছে খাদ্যপ্রাপ্তিবিষয়ক। খাদ্যের সংকট নেই, তবে দরিদ্র মানুষের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। তাছাড়া নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করার বিষয়টি মূলত আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুষ্টিকর খাদ্যের উচ্চমূল্য ছাড়াও আফ্রিকার দেশগুলোয় অদৃশ্য ক্ষুধার অন্যতম কারণ তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া বা দরিদ্র অঞ্চলগুলোয় পুষ্টিকর খাদ্যপ্র্রাপ্তির সীমাবদ্ধতাকেও প্রতিফলিত করে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খাবার রান্না ও সংরক্ষণের বাড়তি খরচ এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমির অভাব।

কভিড-১৯ মহামারী ও এর বিস্তার রোধে আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধগুলো অদৃশ্য ক্ষুধাকে অনেকটাই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। মহামারীর আগে যে মানুষগুলো তাদের রোজকার খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে সমর্থ হতো, হঠাৎ করে তারা খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। গবেষণা মতে, ২০২০ সালে প্রাথমিকভাবে লকডাউন আরোপের সময় ৪৭ শতাংশ পরিবার খাবার ক্রয়ের জন্য অর্থ সংকটে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে যারা পণ্য বিক্রয় করে, এমন বিক্রেতারা লকডাউনের বিধিনিষেধের মুখে কাজ হারান। এদিকে বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার কারণে মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দেয়। জরুরি খাদ্য সাহায্যের জন্য লাইনে দাঁড়ানো দীর্ঘ মানুষের সারি খাদ্য সংকটের বিষয়টি সবার সামনে নিয়ে আসে। মহামারীতে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষুধার মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। কেননা কভিড-১৯-এর কারণে স্কুলভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচিগুলো আকস্মিক বন্ধ হয়ে যায়। 

মহামারীর কারণে অদৃশ্য ক্ষুধার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টি চাহিদা মেটানো জরুরি। আর খাদ্যনিরাপত্তাহীন ব্যক্তিদের অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা বেশি। তাছাড়া কভিড-১৯-এর সঙ্গে ডায়াবেটিসের তীব্রতর সম্পর্ক রয়েছে, অপুষ্ট ও মানহীন খাদ্যের সঙ্গে ডায়াবেটিস সম্পর্কিত। কেপটাউন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, করোনা আক্রান্ত যে রোগীদের আগে থেকে ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের অন্যদের তুলনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা চার গুণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি তিন গুণ বেশি। তবে কভিড-১৯ সংকট একদিকে যেমন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে এবং ক্ষুধার পরিণতি তুলে ধরেছে, তেমনি এটি সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যকর খাবার প্রাপ্তির সম্ভাব্য সমাধানও তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নের মুখে স্থানীয় খাদ্য ব্যবস্থার পুনর্জীবন ঘটছে। লকডাউন আরোপের ফলে অর্থের পর্যাপ্ত জোগানের অভাবে সরকারগুলো যখন বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে কিংবা স্কুলের পুষ্টি কার্যক্রমগুলো বন্ধ করে দিতে ব্যর্থ হয়েছে, নাগরিক সমাজ সেখানে বিদ্যমান শূন্যতাগুলো পূরণে তত্পর হয়ে ওঠে। আমরা দেখি দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে ক্ষুধা মোকাবেলায় কমিউনিটি অ্যাকশন নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ঘটেছে, স্বেচ্ছাসেবীরা খাবারের পাশাপাশি অসহায় গোষ্ঠীগুলোকে প্রয়োজনীয় অন্যান্য চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসেন।

জোহানেসবার্গ ঘিরে আমরা যেমন দেখি সি-১৯ পিপল’স কোয়ালিশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়, বিশেষ করে কভিডের কারণে যারা প্রচলিত বাজারগুলোয় নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যেতে পারছেন না, তাদের পণ্যগুলো ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকার যদি এ ধরনের কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করত তাহলে দুই পক্ষই উপকৃত হতো। কিন্তু বিপরীতে আমরা দেখতে পাই সরকারি খাদ্যসহায়তার বেশির ভাগ প্যাকেজই বৃহৎ করপোরেশনগুলো থেকে ক্রয় করা হয়েছে, যেগুলোর প্রায় সবই অপচনশীল হলেও তেমন কোনো পুষ্টিগুণ নেই। অথচ সি-১৯ পিপল’স কোয়ালিশনের মাধ্যমে যে সবজির প্যাকেজ সরবরাহ করা হয়, সেগুলোর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকাকে সমর্থন দেয়ার পাশাপাশি অপুষ্টিতে আক্রান্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য চাহিদাও পূরণে সক্ষম।

অদৃশ্য ক্ষুধাকে চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর এখনো অনেক কিছুই করার বাকি, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে, তাদের সংবিধানেই খাদ্য অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিতের নির্দেশনা রয়েছে। তাছাড়া আমাদের চোখের সামনে কিন্তু এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যে কীভাবে প্রতিশ্রুতিশীল সরকারগুলো নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যূথবদ্ধ হয়ে কাজ করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সফল হয়েছে।

ব্রাজিলের বেলো হরিজন্টে শহরটিকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘ক্ষুধামুক্ত শহর’ হিসেবে। কাজটি করা হয় কয়েকটি কর্মসূচির অধীনে। এমন একটি উদ্যোগের নাম ‘পপুলার রেস্টুরেন্ট’, যেখানে ভর্তুকির মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হয়; বিভিন্ন দোকান থেকে ক্রেতাকে ভর্তুকিযুক্ত ফলমূল ও শাকসবজি ক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। গঠিত হয়েছে ফুড ব্যাংকও। এর মাধ্যমে খাবারের অপচয় রোধের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের কাছে প্রস্তুতকৃত খাবার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের উৎপাদনকারীদের সঙ্গে দোকানগুলোর সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে সহজেই শহুরে ক্রেতাদের কাছে সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আরো বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি রয়েছে, যা কৃষকদের জীবিকা ও ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি দৃষ্টি দেয়। অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনার পাশাপাশি এ ধরনের কর্মসূচি গোষ্ঠীগুলোকেও সক্ষম ও শক্তিশালী করে।

কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ফুড সিস্টেম সামিট ঘিরে টেকসই ও ন্যায়সংগত খাদ্য ব্যবস্থা তৈরির জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে একত্র করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের নেতা, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সমালোচনা করে বলেন, অযৌক্তিক করপোরেট প্রভাব, অস্বচ্ছ ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বারা কলঙ্কিত একটি ফোরাম তৈরির উদ্দেশ্যে সামিটে খোদ জাতিসংঘেরই বিদ্যমান ওয়ার্ল্ড ফুড সিকিউরিটি কমিটিকে পাশ কাটানো হয়েছে। তারা সামিটটি বয়কটের পাশাপাশি পাল্টা বৈশ্বিক সংহতির আয়োজন করেছে।

জাতিসংঘের এ শীর্ষ সম্মেলনে বড় বড় যে করপোরেশন আধিপত্য বিস্তার করেছে, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বীজ, রাসায়নিক সার, প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং এর খুচরা বিক্রেতা। ক্ষুধা বিমোচনের সমাধান কী, তা তারা কেউই জানে না। খাদ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার মনে করার বিপরীতে একে তারা মূলত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে এবং তা বিক্রির মাধ্যমে বাজার থেকে তারা মুনাফা অর্জনে আগ্রহী। ঠিক এ কারণেই অদৃশ্য ক্ষুধা ক্রমে সংকটে পরিণত হচ্ছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সুপারমার্কেট চেইন ২০২০ সালের মতো বিহ্বল পরিস্থিতিতেও মুনাফা অর্জন করেছে, যেখানে দেশটির অর্ধেকের বেশি পরিবারের খাদ্য ক্রয়ের সক্ষমতা ছিল না। বিপরীতে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের মজুরি প্রদানের সময় উল্টো তাদের যে খাদ্যসহায়তা দেয়া হয়েছে, সে বিষয়টি নিয়ে গর্ব করেছে, যদিও ওই কর্মীদের অনেকেই ন্যূনতম মজুরি পেতেন না। 

অদৃশ্য ক্ষুধা সংকটের বিষয়টির সমাধান অবশ্যই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেই আসতে হবে—একটি পক্ষ যেমন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক—যারা স্বাস্থ্যকর খাবার উৎপাদন করেন এবং দ্বিতীয়ত, নিম্ন আয়ের ভোক্তা—প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যাদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। অথচ জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে এ কণ্ঠগুলো সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে মহামারী চলাকালীন তাদের গৃহীত সংহতিভিত্তিক উদ্যোগগুলো অনেক বেশি সুরক্ষিত ভিত্তির প্রতিনিধিত্ব করে। যার ওপর ভিত্তি করে আরো ন্যায্য ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

ব্রিটানি ক্যাসেলম্যান: সোসাইটি ওয়ার্ক ও  উইটওয়াটারস্যান্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিকস ইনস্টিটিউটের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস