ইটের ব্যবহার এ বঙ্গদেশে বেশ প্রাচীন, দক্ষ কারিগর আবহমান কাল ধরে আমাদের এ জলাভূমিতে তাদের সুনিপুণ কর্মপ্রক্রিয়ায় বিশালাকার ইট শৈলী স্থাপনা নির্মাণে প্রয়াসী ছিলেন। বুদ্ধিমত্তার ছাপ প্রাচীন স্থাপত্যে দৃশ্যমান, আমাদের বঙ্গদেশে ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্রমান্বয়িত স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যে অনেক ভিন্ন রূপ আমরা দেখেছি বটে। ইটের বুননে মন্দির ও মসজিদ গাত্র নবজাগরণের স্থাপত্য দেশ ও বিদেশে আজ বিশেষভাবে সমাদৃত।

শুধু নদীবিধৌত ও জলবায়ুর কারণে যে স্থাপত্যিক ঢঙ প্রাচীন বাংলার মহাবিহারে ও উপাসনালয়ে দৃশ্যমান, তা উচ্চমানের নির্মাণ শৈলীর দাবিদার। ঐতিহাসিক পটভূমিতে প্রাচীন স্থাপনার বাহ্যিক বর্ণনা প্রদান করেছেন ইতিহাসবিদরা, একটি ধ্বংসলীলার অবস্থান, কাল, নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং অবস্থানভেদে এক ধরনের বিস্তারিত চিত্রবত আলোচিত হতো। প্রাচীন স্থাপনা অবশ্যই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করার বিশেষ সুযোগ থেকে যায় বৈকি।

ধ্বংসলীলার স্থাপনাটির আলো-ছায়ার অবগাহনে আগে যে আকার ও আকৃতি প্রাপ্ত সুনিপুণ কাঠামো প্রতীয়মান ছিল, তা কিন্তু যুক্তিযুক্তভাবে নিবিড় গবেষণার দাবি রাখে, ঠিক এ ক্ষেত্রটিতে আমাদের বিশেষ জ্ঞানচর্চার খুব দরকার। শুধু তাই নয়, প্রাচীন স্থাপত্যের অন্দরবিন্যাস অবলোকন, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ আরেকটি জ্ঞানের ভিন্ন শাখা। এই অন্তর্নিহিত ভিন্ন শৃঙ্খলে গবেষণার উপাত্ত অসংখ্য। শুধু অন্দরের সৃজনশীল বিন্যাসে আলো-ছায়ার অধিগ্রহণ অতুলনীয়। অন্দরের আলো-ছায়ার অভিব্যক্তি মনুষ্যমনকে বিভিন্নভাবে আবহমান কাল থেকে প্রভাবিত করে এসেছে। আর এই ‘প্রভাব’-এর ব্যাপ্তি অন্যমাত্রায় অনুভূত হতে থাকে।

আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের শিখিয়েছেন ইটের স্থাপত্যের বুননে আলো-ছায়ার অধিগ্রহণ ও সমন্বয় সৃষ্টিশীলতার এক উচ্চমানের ধ্রুপদী। একইভাবে উপাসনালয়ে বা ঈশ্বরের ঘরে আলোকে প্রবেশ করানো একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন...! হাজার বছর ধরে বঙ্গ ভূভাগে ঈশ্বরের আরাধনা করা সাংস্কৃতিক ধারার অংশবিশেষ। অন্দর স্থাপনায় আলো-ছায়ার খেলা ক্রমান্বয়ে গুপ্ত, পাল, সেন সুলতান, মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলে স্থানগত দিক থেকে সমবৃত্তিমূলক ঘটনার সূচনা দেয়, ভিন্ন এ যুগে স্থাপনায় এবং অন্দরে আলো-ছায়ার বক্তব্য ও তার প্রভাব কেমন ছিল, সেটি আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

আবহাওয়া, জলবায়ু, ভূতাত্ত্বিক আর নির্মাণসামগ্রী ভঙ্গুরের কারণে আমাদের গুপ্তপূর্ব আমলের ধ্বংসাবশেষের সাক্ষ্য বলতে গেলে নেই। সম্রাট অশোকের সময় তাম্রলিপি থেকে পুণ্ড্রনগরের সময়কাল নির্ণীত হয় কিন্তু এ বঙ্গের বয়স আরো অনেক প্রাচীন। যা-ই হোক, মাটির ঘর থেকে পোড়ামাটির ইট নির্মাণ করা গুণগত আবিষ্কারের একটি দীর্ঘ পর্যায় বলা যেতে পারে। গুপ্ত সময়কালের শীর্ণ লম্বা প্রায় মন্দিরগুলো পোড়ামাটির ইটেই নির্মাণ হতো। গর্ভগৃহসর্বস্ব মন্দিরখানি প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনস্বরূপ সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপনা আর গর্ভগৃহের অন্দর হতো আলো-আঁধারঘেরা একটি মায়াবী পরিসর। 

শিখরসমৃদ্ধ এ মন্দিরগুলো সমতল ভূমির ওপরে গুরুত্বের সঙ্গে দণ্ডায়মান ছিল বটে, বৃক্ষরাজির উচ্চতার উপরে অবস্থান করত, যেন বহুদূর থেকে অবলোকনযোগ্য হয়। একটি গর্ভগৃহে আলো আসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপায়ে। দেবতার ঘরে আলোর অনুপ্রবেশে নাটকীয়তা দেখা যায়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলোকে জালির ভেতর দিয়ে ‘ঈশ্বরের আলো’ রূপে সেই গর্ভগৃহে আবির্ভাব ঘটে; আলো-ছায়ার মায়াবী দৃশ্যপট সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পোড়ামাটির ইটের বুননের তিন দেয়াল, আলোর প্রতিফলনে রক্তিম আভা অন্য চতুর্থ মাত্রায় তীর্থযাত্রীদের সংবেদনশীল করে তোলে। আধ্যাত্মিকতার যোগসূত্রটা তীর্থের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। ছোট এ গর্ভগৃহ ও তার পরিসরগত অবস্থান ভিন্ন অনুভবের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়।

বৌদ্ধ সময়কালে (অষ্টম শতাব্দী) এ জনপদের মানুষ/কারিগররা প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও পরিচালনায় মহাবিহার নির্মাণ করেন শুধু ইটের সহায়তায়। বিশালাকার স্তূপ মন্দিরের অন্দর বা উপাসনালয় অপেক্ষাকৃত অল্প আলোয় পরিবেশকে বিশেষ আবহতে উত্তীর্ণ করত। ধারণা করা যায়, বৌদ্ধ কৃষ্টি, আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রঙের সমারোহ ও কেতন প্রস্তুত করা হতো, যা উৎসবমুখর পরিবেশের উপস্থাপন করত। বিশাল গর্ভগৃহেও কিন্তু রঙের প্রচলন ছিল, রঙ আর আলোকরশ্মির সন্নিবেশন প্রকোষ্ঠে থাকা স্বর্ণের রঙে  মোড়ানো গৌতম বুদ্ধের বিশালাকার কাঠের মূর্তির গাত্র অবগাহন হতো; হয়তো তখন ঐশ্বরিক পটভূমিকা অবতীর্ণ হতো, যা এখন শুধুই কল্পনাযোগ্য...! প্রদীপের আলো আর শীর্ণকার সূর্য আলোকরশ্মি উঁচু ছাদের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রবেশের দ্বারা অভূতপূর্ব সোনাঝরা অন্দরপরিসরের উপাখ্যান ঘটে। পাহাড়পুরের কেন্দ্রীয় স্তূপ মন্দিরের গর্ভগৃহ ও এর সম্মুখ সমাগমের ঘরটি অপেক্ষাকৃত উঁচু ছিল (ধ্বংসস্তূপ নিরীক্ষণের মাধ্যমে)। উঁচু ছাদবিশিষ্ট কোনো স্থানের অনুভব আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্র তৈরি করতে সহায়ক হয়। আর তার সঙ্গে আলো-ছায়ার আবির্ভাব স্থানের স্থিতাবস্থাকে গতিশীল করে।

একইভাবে বিহারের বারান্দা ও ঘরগুলোয় আলো-ছায়ার পুনরাবৃত্তি যেন ঐশ্বরিক আখ্যান।

মধ্যযুগে বাংলার পোড়ামাটির ইটের মসজিদ ও মন্দির সমকালীন গ্রামীণ স্থাপনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়, বক্র কার্নিশ, খুঁটি, দুচালা, চৌচালা আর রত্নসমৃদ্ধ উপকরণ বাংলার মসজিদ তথা মন্দির স্থাপত্যে দেখা যায়। এ অনুপ্রেরণা ইতিবাচক দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যা পৃথিবীর স্থাপত্য ইতিহাসে শিখরে অবস্থান করে নিয়েছে। সুলতানি মসজিদগুলো সহজ-সরল স্বীকারোক্তি, টেরাকোটায় গাত্রবর্ণের যে সৌন্দর্য, তা বিশদভাবে পরিলক্ষিত হয় সূর্যরশ্মির অবগাহনে। সূক্ষ্ম পোড়ামাটির কারুকাজ তীর্থদের সম্মোহন করত, যা আজও করে যাচ্ছে। রক্তিম বর্ণের মসজিদ গাত্র বাইরে থেকে যেমন সংবেদনশীল, ঠিক তেমনি অন্দরের অবয়ব সৃষ্টিশীলতার ও অপার্থিব পরিসরের দ্বারা মুসল্লিদের আত্মতুষ্টি ঘটায়। একটু ভেঙে বলি, মসজিদ স্থাপনা এই বাংলায় আবির্ভাব হয়েছে সাধারণ কাঠামোর ধারণায়, প্যাভিলিয়ন কাঠামো বাংলার গ্রামীণ স্থাপনার সহজাত রূপ, বাংলার সুলতানি মসজিদের অবয়ব প্যাভিলিয়ন কাঠামো ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। তার মানে চারটি খুঁটির ওপর একটি ছাদ হলো প্যাভিলিয়ন। যেখানে আলো-বাতাস সবসময় ভরপুর। আলোর আধিক্য সুলতানি মসজিদগুলোয় পরিলক্ষিত হয়, আলোয় উদ্ভাসিত রক্তিম পোড়ামাটির চার দেয়ালে প্রতিফলিত আলোয় নতুন মনোযোগের সঙ্গে মুসল্লিরা আল্লাহর কাছে মাথা নত করেন। বঙ্গদেশের অবস্থানগত কারণে পশ্চিম দিকটি মেহরাব দেয়াল ও কিবলা হওয়ায় কারুকাজ অন্দরে অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যায়। পশ্চিম দেয়ালে কোনো ওপেনিং থাকে না, বাকি তিনটি দেয়াল প্রবেশ আর বাতাস আসা-যাওয়ার জন্য বেশ বটে। অন্দর পরিসর সুলতানি মসজিদের আলোয় ভরা উদ্ভাসিত স্থান, যেখানে সম্পূর্ণ সুলতানি মসজিদটির কাঠামো শৈলী ওই আলোর প্রতিফলনে আরো গতিশীল অন্দর তৈরি করতে সক্ষম হয়। উচ্চতা থাকার কারণে আলোর গঠন ও প্রতিফলন বিশেষভাবে আচ্ছাদিত তলগুলোকে বিকশিত করে তোলে।

পোড়ামাটির ইটের মন্দিরগুলোর বাহ্যিক গঠনে স্পন্দন আসে আলো-ছায়ার খেলায়। উল্লেখ্য, মন্দির গাত্রগুলোয় তত্কালীন সমাজ ব্যবস্থা, রাজা-মহারাজার দৈনন্দিন জীবন, শিকার করা আবার রামায়ণ ও মহাভারতের যুদ্ধের দৃশ্যপট, ছোট টেরাকোটার প্লাকগুলোয় আপন আলোয় বিদ্যমান। প্রকারের ভিন্নতা থাকার কারণে গর্ভগৃহে আলো-ছায়ার বিন্যাসে পরিবর্তন আসত। মধ্যযুগে বাংলার মন্দিরের সঙ্গে গর্ভগৃহের সম্মুখে চাঁদোয়া ব্যবহার করা হতো। এ অস্থায়ী কাঠামো মন্দির পরিসরটিকে স্পন্দনশীল করত। কখনো আবার রঙ-বেরঙের চাঁদোয়া ব্যবহারও হতো, তাতে আলো-আঁধারের সঙ্গে রঙের আভার সংমিশ্রণ ও তার প্রতিফলন গর্ভগৃহ এবং তার গাত্র আধ্যাত্মিকতায় নবসন্ধিক্ষণ সৃষ্টি করত। চাঁদোয়া ব্যবহারের রেওয়াজ বঙ্গদেশে অনেক প্রাচীন, যেকোনো গণসমাগমে বহুকাল ধরে চাঁদোয়ার ব্যবহার দেখা যায় ক্ষেত্রভেদে। অস্থায়ী অবকাঠামোটিকে মন্দিরের মণ্ডপ বলে এ বাংলায় আখ্যা দেয়া যেতে পারে। 

এ বঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারি পদার্পণ করেছিল ১৫২৫-এর দিকে। পর্তুগিজরা সমুদ্রপথে ব্যবসা করার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম সম্প্রসারণের কাজ বঙ্গদেশের দুর্গম এলাকায় শুরু করে। ভাওয়ালের জঙ্গল, বঙ্গের উপকূল এলাকা, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, ঢাকার পোস্তাগোলা প্রমুখ অঞ্চল। ছোট আকারে চার্চ স্থাপনের মাধ্যমে তারা ধর্ম প্রচারণা শুরু করেন। আদি এসব গির্জার স্থাপত্যধারা প্রায় একই রকমের হতো। মধ্যযুগের ইউরোপীয় ক্যাথিড্রালের আলোকে মিনিয়েচার গির্জা শৈলী বঙ্গের জলজ ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। গির্জার অন্দরে আলো-ছায়ার অভিব্যক্তি ভিন্ন। বিশালাকার গণজমায়েতের হল, উচ্চতার সন্নিবেশনে প্রশস্থ দেয়ালের উপরিভাগ বিশেষ জানালার রঙিন কাচের মাধ্যমে ভেতর দিয়ে রঙ-বেরঙের আলোকরশ্মির ছটা একটি অপার্থিব আবহ সৃষ্টি করে। আলো-ছায়ার ও নীরবতার অনুভূতি ঈশ্বরের অবস্থানকে সবাইকে কাছে নিয়ে আসে। গির্জায় আরো একভাবে আলো আসে, ভবনের দুই পাশে আইল থাকার কারণে আলোর সঞ্চালন নিচের অংশে দেখা যায়। তবে তা স্বল্প পরিসরে।

আলো-ছায়ার মায়া ধর্মীয় স্থাপনা ভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আলো-ছায়ার খেলা অন্দরে প্রতীয়মান করে স্থাপনার অন্তর্নিহিত আভা ও প্রাঞ্জল।

    আলোকরশ্মি আলোর সঞ্চালন বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যে গতির সমীকরণ সৃষ্টি করে, স্থাপনার ফ্যাসাদে চঞ্চলতার আলোড়ন প্রকৃতির সঙ্গে সান্দ্র অবস্থানে লিপ্ত হয়। বাংলার স্থাপত্য ধারাকে বারবার অনুশীলনের দ্বারা আলো-ছায়ায় কার্যত কীভাবে পরস্ফুিটন ঘটবে, তা নিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা মহতী গবেষণা করেছেন। আলো-ছায়ার অভিসরণ ধর্মীয় স্থাপনায় একক শৈলীর উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে স্থাপত্য ইতিহাসে নিজের স্থান করে নিয়েছে, যা আজও অমলিন ও দৃষ্টান্তমুখর। 

 

ড. সাজিদ বিন দোজা: বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ