দীর্ঘ ৬২ সপ্তাহ পর ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে। তার মানে এই নয় যে সেদিন থেকে সেখানে পঠন-পাঠন শুরু হবে। সেটা কবে থেকে শুরু হবে তা এখনো জানা যায়নি। তবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে, এটাই এখন বড় খবর। অন্তত আমাদের সন্তানদের আবার পাঠে ফিরিয়ে আনার সুমতি হয়েছে কর্তৃপক্ষের, তাতেই আমরা খুশি। পড়ুয়ারা কর্মহীনের ক্লান্তিতে ভুগছে। অনেকেই বিষাদের শিকার। অনেকে আত্মহত্যা করেছে। এ ক্ষতি পূরণ হবে না কোনো দিন।

৬২ সপ্তাহ পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কলকাকলিতে মুখর হবে ক্যাম্পাস। ভাবতেই শিহরণ জাগছে।

দুনিয়ায় সবচেয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে আছে মাত্র দুটো দেশের পড়ুয়ারা—বাংলাদেশ আর ভেনিজুয়েলা। দুটো দেশেই ৬২ সপ্তাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আমাদের পড়শি দেশগুলোর অবস্থা কিন্তু এত খারাপ নয়। কিন্তু বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকল? তা নিয়ে নানা মত জারি আছে। সবচেয়ে বড় মতটি হচ্ছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।

কভিড মোকাবেলায় আমরা খুব খারাপ না করলেও উজ্জ্বল কিছু করতে পারিনি। ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও টিকা দিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।

দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বহু পড়ুয়া ঝরে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঠিক কত শতাংশ পড়ুয়া ঝরে পড়েছে তা বোঝা যাবে প্রতিষ্ঠান খোলার পর সমীক্ষা করলে। তাছাড়া ভেঙে গেছে মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্যও। এসব নিয়ে নিরপেক্ষ সমীক্ষা জরুরি। অনেক অভিভাবক চাকরি হারিয়েছেন। অনেকের রোজগার কমে গেছে। অনেকে গ্রামে ফিরে গেছেন। স্থানান্তরের ফলেও অনেক পড়ুয়া আগের প্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারবে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু পড়ুয়া টিউশনি করে লেখাপড়া করতেন। তারা টিউশনি হারিয়েছেন। নতুন করে টিউশনি খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না তাদের পক্ষে। সব মিলিয়ে অবস্থা কতটা ভয়াবহ, তা জানা যাবে আগামী দিনগুলোয়।

এদিকে স্কুল, কলেজ খোলার আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের পড়ুয়াদের ঘাড়ে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র সার্টিফিকেট নামে দুটো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেখান থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ নেই। এত বড় অতিমারীর মধ্যে যেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভূত। কর্তৃপক্ষের এক কথা। পরীক্ষা নিতেই হবে। দেড় বছরের বেশি লেখাপড়া বন্ধ। কিন্তু নভেম্বর, ডিসেম্বরে অপ্রয়োজনীয় দুটি পরীক্ষা নিতে তাদের সমস্যা হবে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাই লক্ষ্য। শিক্ষার সংজ্ঞা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বদলে গেছে সারা দুনিয়ায়। আমরা তার খবর রাখি না। আমাদের শিক্ষা সার্টিফিকেটসর্বস্ব। সে সার্টিফিকেট বুকে ঝুলিয়ে পেটের ভাত জোটে না। উন্নত জীবন দূর অস্ত।

উচ্চশিক্ষার নামে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ দেশের বৃহত্তম ননটিচিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও। তারা ব্যাঙের ছাতার চাষ শুরু করেছে। যেখানে সেখানে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের অনুমতি দিয়ে উচ্চশিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। অধিকাংশ কলেজেই অনার্স-মাস্টার্স কোর্স পঠন-পাঠনের সুবিধা নেই; নেই উপযুক্ত শিক্ষক, সংখ্যায় ও মানে; নেই লাইব্রেরি-সেমিনারের ব্যবস্থা। মননচর্চার প্রশ্ন সেখানে অবান্তর। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অদ্ভুত নিয়মে সারা দেশে শিক্ষার নামে বাণিজ্য চালু হয়েছে। এটি দ্রুত বন্ধ করা জরুরি। না হলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে।

এসবই পুরনো সমস্যা। গত দেড় বছরে কভিড নতুন নতুন সমস্যার জন্ম দিয়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ধরনের সমস্যার পাহাড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সমস্যা আগের চেয়ে কমেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবকাঠামোর অভাব নেই কিন্তু আছে শিক্ষকস্বল্পতা। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন এবং তাদের বেতন-ভাতা প্রদানে কর্তৃপক্ষের অনীহা সীমাহীন।

আরো বহু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সমস্যাই প্রকটভাবে সামনে এসেছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এসব সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দুটোই কম।

সমস্যার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া মানবধর্ম। বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট এ অতিমারী মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কভিড মোকাবেলায় সবার মাস্ক পরা অপরিহার্য। কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্রমণ ঠেকানো অব্যাহত রাখতে হবে। আর নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য ভ্যাকসিন। আমরা ভ্যাকসিন উৎপাদন করি না, আমদানি করি। সেক্ষেত্রে আমরা পরনির্ভরশীল। আবার ১৭ কোটি মানুষের দেশে অন্তত ১৩ কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে মোট ২৬ কোটি টিকা দেয়াও সহজ কাজ নয়। এখন পর্যন্ত ২৫ বছরের নিচে বয়সীদের টিকাকরণের সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু বিদ্যালয়ে ১৪-১৫, কলেজে ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সীরাই পড়াশোনা করে। অনেক দেশ ১২ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা দিচ্ছে। আমরা সেটা কবে শুরু করব তা এখনো অজানা। তাই সব পড়ুয়াকে একসঙ্গে ক্লাসে ফেরানো সম্ভব হবে না। বিকল্প দিনে ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। একই ক্লাসের পড়ুয়াদের বিভিন্ন কক্ষে বসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করতে হবে। নজর রাখতে হবে তাদের শারীরিক সুস্থতার ওপর। যদি কারো মধ্যে বিমারির লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য ছুটি দিতে হবে। এসব কথা যত সহজে বলা গেল, বাস্তবে এত সহজ হবে না।

তার পরও আমরা চাই স্কুল, কলেজ খুলুক। শুরু হোক শিক্ষা কার্যক্রম। নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

 

আমিরুল আলম খান: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান