চালের  দাম অব্যাহত বৃদ্ধির মুখে সরকার আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরই মধ্যে বাজারে আমদানি করা চালও এসে পৌঁছেছে। সরকারিভাবে চালের মজুদ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বেসরকারি মজুদের পরিসংখ্যান না পেলেও উৎপাদন ও আমদানির তথ্য বলছে, ব্যবসায়ী ও মিলারদের কাছে বিপুল পরিমাণ চাল মজুদ রয়েছে। কিন্তু এর পরও চালের দাম কমেনি। অভিযোগ উঠেছে, মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিক সময় চাল মজুদ রাখছেন এবং দাম বাড়াচ্ছেন। বাজার স্থিতিশীল রাখতে কর্তৃপক্ষের উচিত আইনের ব্যত্যয় ঘটছে কিনা তা তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একই সঙ্গে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চাল আমদানি সহজ করার পর সরকারি-বেসরকারি নানাভাবেই চাল আসছে দেশে। ধানের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও ভালো হয়েছে। প্রচুর মজুদ গড়ে উঠেছে বলেও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। এর পরও দাম না কমাটা বোধগম্য নয়। করোনার মধ্যে মানুষের আয় কমেছে। এমন সময়ে চালের মতো অপরিহার্য পণ্যের দাম বাড়লে তা অত্যন্ত দুর্ভোগের কারণ হয়ে ওঠে। একদিকে কৃষক অধিকাংশ সময় ধানের উৎপাদন খরচও পান না, অন্যদিকে ভোক্তাকে চড়া মূল্যে এখন চাল কিনতে হচ্ছে। এ টাকাও কৃষকের ঘরে যাবে না। এক্ষেত্রে খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে চালের মূল্যও। বাজারের বর্তমান অবস্থায় চালের দাম কমাতে হলে পুরোদমে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সরকারের কাছে চালের মজুদ থাকা যেমন দরকার, এর চেয়ে বেশি জরুরি তা অসহায়দের কাছে পৌঁছানো। সরকারের গুদামে থাকা চাল টিসিবি ও খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে খোলাবাজারে বিক্রির পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে। আগে হতদরিদ্র মানুষই লাইনে দাঁড়াত। এখন নিম্নমধ্যবিত্তরাও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সেক্ষেত্রে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ কথা সত্য, সংকট সমাধানে ওএমএস কিংবা টিসিবির কার্যক্রম জোরদার করা সাময়িক ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চালের বাজার যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ও মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়েও কারণ ছাড়াই দাম বাড়ছে, তার বিপরীতে প্রশাসনের পদক্ষেপ সামান্যই দেখা যাচ্ছে। সবাই জানে, চালসহ খাদ্যপণ্যের বাজারে লাভের অধিকাংশই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। এর প্রতিকার প্রয়োজন।

দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে পণ্যের বণ্টন ব্যবস্থায় যাতে কোনো ধরনের অসংগতি তৈরি না হয় সেজন্য ফুড এজেন্সি রয়েছে। তারা নিয়মিত বিরতিতে বিষয়গুলো নজরদারি করে সরকারকে সুপারিশ দেয়। এমনকি আগাম পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে তারা। এর ওপর ভিত্তি করে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে থাকে। সংকট বেশি দেখা দিলে সরকারের পক্ষ থেকে দামও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশেও বাজার তদারকি ও বাজার বিশ্লেষণসহ পরামর্শ প্রদানের জন্য অধিদপ্তর ও কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কিন্তু তাদের সক্ষমতা ও দক্ষতা এত স্বল্প, যা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। তার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উন্নয়নশীল দেশের উপযোগী করে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। ভারতে চালের উৎপাদন পর্যায় থেকে বণ্টন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। দেশটির ফুড করপোরেশন (এফসিআই) সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যূনতম সমর্থন মূল্যে ধান ক্রয় করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মজুদ করে রাখে। এছাড়া মিলাররা যাতে অতিরিক্ত চাল মজুদ করে বাজারকে অস্থির করতে না পারে সেজন্য ২০১৫ সালে ভারতে প্রবর্তন করা হয় লেভি সিস্টেম। এর আওতায় মিলাররা তাদের মজুদকৃত চালের ৭৫ শতাংশ সরকারকে দিতে বাধ্য। তবে বাকি ২৫ শতাংশ তারা বাজারে বিক্রি করতে পারেন। বাংলাদেশও এমন পদক্ষেপ নিতে পারে। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়ায় চালের দাম বাংলাদেশ থেকে কম বলে জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে মজুদ পর্যাপ্ত থাকার পরও চালের দাম বাড়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মিলাররা জানাচ্ছেন, বেশি দামে ধান কেনার পর মাড়াই, বহন, ব্যাংক সুদ, মজুরির খরচ যুক্ত করে দাম নির্ধারণের মাধ্যমে ন্যূনতম মুনাফা করছেন। প্রতিটি মিলের পরিচালন সক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মজুদ রাখার বিষয়টি সরকারি আইন দ্বারা স্বীকৃত। সরকারের সে আইন মেনেই দেশের প্রতিটি চালকল পরিচালিত হচ্ছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ মুনাফা করলে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। তাদের কথা মেনেই সরকার বেসরকারি গুদাম, চালকলসহ অটো রাইস মিলের মজুদ পরিস্থিতি ও দাম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কৃষক থেকে মিলার-ব্যবসায়ী ও সেখান থেকে প্রান্তিক ক্রেতা পর্যন্ত চাল আসার যে চেইন তাতে কোনো সমস্যা হলে বাজারে তার প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। মিলার ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে অতি মুনাফা শিকারের প্রবণতা বরাবরই লক্ষ্য করা যায়। কখনো চাল বা ধান মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয় ও সে সংকটের অছিলা ধরে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। এটি প্রতিহতের ব্যবস্থা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সরকার বলছে, সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষম এমন ১০০টি অটো রাইস মিলের মিলগেটের দাম পর্যবেক্ষণের জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুতই এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে কারসাজির সন্ধান পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।

বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ফুড গ্রেইন লাইসেন্স ছাড়া চালের ব্যবসা করতে পারবেন না। তাদের ১৫ দিন পরপর ব্যবসায়িক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। মজুদ পরিস্থিতি ও কী দামে কিনছেন এবং কী দামে বিক্রি করছেন, সেটি উল্লেখ থাকতে হবে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে। কিন্তু পদ্ধতিটি এখনো ম্যানুয়ালি পরিচালিত হওয়ায় সরকারের তথ্য পেতে দেরি হচ্ছে। এতে ব্যবস্থা নিতেও সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। দ্রুতই এটি ডিজিটাল করা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, চালের বাজারে এমন কিছু গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে, যারা চালের দাম তো কমাচ্ছেই না উপরন্তু বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চাল মজুদ করে রাখছে। তারা সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কারা অন্যায়ভাবে এসব কারসাজি করছে, প্রশাসন চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তাদের ব্যাংকঋণ প্রদানও বন্ধ করা যেতে পারে। লকডাউনের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য দ্রব্যের দাম বড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন যেহেতু করোনার বিধিনিষেধ উঠে গেছে, বাজারে যাতে কোনো পণ্যের সরবরাহে সংকট না হয়, সেদিকে প্রশাসনকে দৃষ্টি দিতে হবে। মিলারদের মজুদ পরিস্থিতি যেমন জানতে হবে, তেমনি কতটুকু মুনাফা করছেন সেটিও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

চালের দাম বাড়লে সব শ্রেণির ক্রেতাকেই বাড়তি দামে চাল কিনতে হয়। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়ে নিম্নবিত্তের মানুষ ও যাদের আয় সুনির্দিষ্ট। আয়-রোজগারের উপায় এমনিতেই সীমিত। নিরুপায় হয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো খরচ কমানো যায়, প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারটি প্রলম্বিতও করা যায়, কিন্তু চালের খরচ কমানো যায় না। যত দামই হোক, চাল কিনতেই হয়। এ কারণে চালের দাম বাড়ার ব্যাপারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে বিবেচিত। চালের দাম বাড়লে মানুষ ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়। এজন্য সরকার চালের দামের বিষয়টিকে সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আমরা আশা করি, সরকার চালের দাম বাড়ার এ প্রবণতা রোধে অবিলম্বে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে। এর পেছনে কোনো কারসাজি থাকলে তা বন্ধ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাকে সময়োপযোগী, শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।