ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্জ একটা দীর্ঘ সময় কেনিয়ায় কাটিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কীভাবে স্থানীয় অর্থনীতি পরিচালিত হয়, তার বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখেছিলেন। বর্গাচাষ ছিল তার মধ্যে অন্যতম। তিনি অবাক হয়েছিলেন, চাষীদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেকই জমিদারদের দিয়ে দিতে হয়। এটা জেনে তার মধ্যে একগুচ্ছ প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। ফসলের অর্ধেক যদি ভূমি মালিকদের দিতে হয়, তাহলে কৃষিতে এত প্রণোদনা দিতে হয় কেন? এতে কি আসলে কৃষিতে দক্ষতা কমছে না? কেন তাহলে এ ব্যবস্থা বজায় আছে?

কেনিয়ার কৃষির এই বৈপরীত্য বা কূটাভাস তাকে অসম তথ্যের ওপর তার মৌলিক তত্ত্ব উন্নয়নের দিকে চালিত করেছিল, যার জন্য পরবর্তী সময়ে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেছিলেন, কেনিয়ায় কাটানো সময়টা তথ্যের অর্থনীতির ওপর আমার ধারণা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

একইভাবে অর্থনীতিবিদ আলবার্ট হার্শম্যানও দীর্ঘদিন নাইজেরিয়ায় ছিলেন। সেখানে স্থানীয় অর্থনীতিতে তিনি এমন কিছু আচরণ লক্ষ করেছিলেন, যা তাকে কিছুটা বিস্মিত করেছিল। দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের হাতে থাকা রেল কোম্পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পরিবহন কোম্পানির প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছিল সেখানে। কিন্তু প্রতিযোগিতার এ চাপ মোকাবেলায় দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত রেল কোম্পানির অবস্থা বরং আরো খারাপ হয়েছিল। নাইজেরিয়ার রেল পরিবহন বিষয়ে হার্শম্যানের এ পর্যবেক্ষণ ছিল তার প্রভাবশালী বই এক্সিট, ভয়েস অ্যান্ড লয়েলটির আকর (হার্শম্যান যদিও পুরোপুরিভাবে নোবেল পাওয়ার যোগ্য হলেও তাকে কখনো দেয়া হয়নি)।

সন্দেহ নেই, এসব গল্প নিজস্ব সব বৈচিত্র্য নিয়ে পৃথিবীকে দেখতে পারার গুরুত্ব সামনে আনে। একটি বিষয় পরিষ্কার যে সামাজিক বিজ্ঞানগুলো তখনই সমৃদ্ধ হয়, যখন লব্ধ জ্ঞান-প্রজ্ঞা ‘অদ্ভুত ব্যতিক্রমী’ আচরণ বা অপরিচিত পরিবেশের আউটকামের মুখোমুখি হয় এবং যখন স্থানীয় অবস্থার বৈচিত্র্য পুরোপুরিভাবে বিবেচনায় আনা হয়।   

এ পর্যবেক্ষণ অবশ্যই সর্বজনগ্রাহ্য হওয়া উচিত। যদিও অর্থশাস্ত্রের পাঠ যেভাবে আয়োজন করা হয়, তাতে একজন পড়ুয়া বা গবেষকের তা জানার সুযোগ কম। এখনো শীর্ষ অর্থনৈতিক জার্নালগুলোয় ব্যাপকভাবে আধিপত্য বিস্তার করছেন গুটিকয়েক ধনী দেশভিত্তিক লেখকই। এ পেশার হর্তাকর্তারাও মূলত আসছেন একই দেশগুলোর বিদ্যায়তনিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে। এ শাস্ত্রে বাকি বিশ্বের কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি কেবল অন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, সামনে আনে এর দীনতাও।

সম্প্রতি আমি ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছি। এর সূত্র ধরে অর্থনৈতিক প্রকাশনাগুলোয় প্রকাশিত নিবন্ধের লেখকদের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের ওপর তথ্য খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি এক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক ও পদ্ধতিগত তথ্য আশ্চর্যজনকভাবে কম পেয়েছি। সৌভাগ্যক্রমে, সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব টুরিনের মাগদা ফন্টেনা ও পাওলো রেক্কা এবং মিলানের ইউনিভার্সিটা ক্যাটোলিকা ডেল স্যাকরো কয়োই কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য চমত্কার কিছু প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ আমাদের সামনে হাজির করে।

আমি আগেই যেমনটা সংশয় প্রকাশ করেছিলাম, তারই প্রতিফলন ঘটেছে তাদের তথ্যে। তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই শীর্ষ অর্থনৈতিক জার্নালগুলোয় লেখকের ব্যাপকতর ভৌগোলিক কেন্দ্রীভূতকরণের বিষয়টিই দেখা যায়। তথ্য বলছে, শীর্ষ আটটি জার্নালের প্রায় ৯০ শতাংশ লেখকই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপভিত্তিক। আবার এসব প্রকাশনার সম্পাদকীয় বোর্ড সদস্যদের ক্ষেত্রেও অবস্থা প্রায় সমরূপ।    

এসব দেশ বৈশ্বিক জিডিপির কেবল এক-তৃতীয়াংশ জোগানদাতা হলেও প্রকাশনায় ভৌগোলিকভাবে পশ্চিম দেশগুলোর অতিকেন্দ্রিকতা অপর্যাপ্ত সম্পদ বা বাকি বিশ্বে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে কম বিনিয়োগ দ্বারা পুরোপুরিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না; যদিও ওইসব ফ্যাক্টর কিছুটা অবশ্যই ভূমিকা পালন করে।

প্রকৃতপক্ষে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু দেশ ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি করলেও শীর্ষ জার্নালগুলোয় এখনো তাদের অবস্থান লক্ষণীয়ভাবে কম প্রতিনিধিত্বশীল। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে প্রকাশিত প্রকাশনার অংশও কম। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে এসব অঞ্চল যেভাবে এরই মধ্যে একটা গুরুত্ব অর্জন করেছে, তার তুলনায় প্রকাশনার সংখ্যা তাত্পর্যজনকভাবে বেশ নিচে রয়ে গেছে।

সম্পদ ও প্রশিক্ষণ বাদে নেটওয়ার্কে অভিগম্যতা জ্ঞান সৃজন ও বিস্তারের মূল চাবিকাঠি। একটি গবেষণাকর্মকে গভীরভাবে বিবেচনায় নেয়া হয় সংশ্লিষ্ট গবেষক বা লেখকটি যথাযথ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন কিনা, সঠিক লোকজনের কাছে গিয়েছিলেন কিনা এবং সঠিক সম্মেলনগুলোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন কিনা এসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। অর্থনীতিতে প্রাসঙ্গিক নেটওয়ার্কগুলো ব্যাপক অসামঞ্জস্যহীনভাবে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপভিত্তিক।

এখানে যে অনুমানযোগ্য আপত্তি আসতে পারে তা হলো, আমাদের আজকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের অনেকেই তো নিজেরা এসেছে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপকেন্দ্রিকতার মানেটা কী! সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে এসে কিছু ক্ষেত্রে তারা আরো বেশি আন্তর্জাতিক হয়েছে। উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাবশালী অর্থনীতি বিভাগ এবং গবেষণা নেটওয়ার্কগুলোয় বিদেশে জন্ম নেয়া গবেষকদের সংখ্যা বেড়েছে। তুরস্ক থেকে আসা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি (১৮ বছর বয়সে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেছিলাম)  নিশ্চিতভাবে এসব নেটওয়ার্ক থেকে প্রভূত উপকৃত হয়েছি।

উন্নত দেশগুলোয় উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা গবেষকরা অধিক মনোযোগও পেয়ে আসছেন। বিষয়টি এটিই ইঙ্গিত দেয় যে খোদ শাস্ত্রের মধ্যেই উন্নয়ন অর্থনীতি অনেক বেশি প্রভাববিস্তারী জায়গা করে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে আমার তত্ত্বাবধানে উন্নয়ন অর্থনীতির যে মাস্টার্স প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়, তাতে খুব স্বল্পসংখ্যক ফ্যাকাল্টি সদস্যই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা। বাকিরা এসেছেন পেরু, ভেনিজুয়েলা, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ক্যামেরুন থেকে।

তবে এসব ইতিবাচক অগ্রগতির কোনোটিই স্থানীয় জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পুরোপুরিভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়নি। বিদেশী বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদরা সাধারণত ধনী দেশগুলোর ইস্যু ও উদ্বেগগুলো দ্বারা প্রভাবিত একটা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশেই লালিত হয়েছে। বিচিত্র স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে ভিজিটিং অর্থনীতিবিদদের এক্সপোজার ঘটনার আকস্মিকতা এবং কাকতাল পর্যায়ে রয়ে গেছে, স্টিগলিত্জ ও হার্শম্যানের গল্প যেমনটা বলে। কেবল একটা দৃশ্য কল্পনা করুন যে গুরুত্বপূর্ণ সব ধারণা অনাবিষ্কৃত-অনুন্মোচিত রয়ে গেছে, কেননা গবেষক থেকে শুরু করে বিদ্যায়তনিক চৌহদ্দি সবখানে এখনো বিভিন্ন দেশের স্থানীয় অর্থনীতির বৈচিত্র্য অন্বেষণে ঘাটতি বিদ্যমান।

অর্থনীতি বর্তমানে লিঙ্গ ও বর্ণগত ভাসাম্যহীনতার দিক থেকে একটি আত্মসন্ধানী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যা উপস্থাপন বা তুলে ধরতে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে অনেক নতুন উদ্যোগ চলমান। কিন্তু ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের বিষয়টি এ আলোচনা থেকে অনেকটাই অনুপস্থিত রয়ে গেছে। অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে কখনো একটি বৈশ্বিক শাস্ত্রে হতে পারবে না, যদি আমরা এ ঘাটতি পরিপূরণে প্রচেষ্টা না নিই।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

ডনি রদ্রিক: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির অধ্যাপক; স্ট্রেইট টক অব ট্রেড: আইডিয়াজ ফর অ্যা সেইন ওয়ার্ল্ড ইকোনমি গ্রন্থের লেখক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির