ফলন-পরবর্তী পর্যায়ে ধান ও চাল নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে অনেক আগেই। এবার উৎপাদন পর্যায়েই ১৮-২০ শতাংশ ধান বিনষ্ট হওয়ার খবর মিলছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষক পর্যায় ও জাতের কারণে প্রতি বছর ৬৭ লাখ টন চাল নষ্ট হয়। চালের ঘাটতি মেটাতে বছরে গড়ে ৩৫-৪০ লাখ টন আমদানি করতে হয়। অথচ প্রতি বছর উৎপাদন পর্যায়ে ধান বিনষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা গেলে চালের আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতো না। ধানের উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। একরপ্রতি ফলনও সর্বোচ্চ সীমায়। তার পরও বিপুল পরিমাণ খাদ্য ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষির উৎপাদন প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে না। এক্ষেত্রে ফলন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অপচয়ের রাশ টেনে ধরতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে আরো সক্রিয় হতে হবে। এতে উৎপাদন ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে।

ফলন নষ্ট বা অপচয় দুটি পর্যায়ে ঘটে। প্রথমটি খাদ্য উৎপাদন থেকে বিক্রয়কেন্দ্র পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলটি। আর দ্বিতীয়টি ভোক্তার খাদ্য নির্বাচন থেকে তার ব্যবহার পর্যন্ত। উন্নত দেশগুলোয় খাদ্যের অপচয় বেশি হয় দ্বিতীয় পর্যায়ে। আর বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে ক্ষতি বা অপচয় বেশি হয়। তার কারণ মাঠ পর্যায়ে পরিচর্যার অভাব, সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, সময় মেনে কাজ না করা, পরিবহন, সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আধুনিক পরিকাঠামোর অনুপস্থিতি। বিভিন্ন মাত্রায় ফসলের এ অপচয় প্রি-হারভেস্ট, হারভেস্ট ও পোস্ট-হারভেস্ট পর্যায়ে ঘটে। প্রি-হারভেস্ট পর্যায়ে ফসলের অপচয় সাধারণ পোকামাকড়, আগাছা, ইঁদুর, কর্তনের সময় শস্যের পরিপক্বতা, সঠিক সময়ে সার প্রদান না করা, আর্দ্রতার পরিমাণ, আবহাওয়া, ধানের জাত ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। হারভেস্ট পর্যায়ে অপচয় বলতে ফসল কর্তনের শুরু থেকে কর্তন শেষ পর্যন্ত অপচয়কে বোঝানো হয়। এটি সাধারণত পরিপক্ব শস্যের শীষ থেকে পড়ে যাওয়ার মাধ্যমে ঘটে, যা শাটারিংজনিত অপচয় নামে পরিচিত। তাই ফসল কর্তনের সময় সঠিক পরিপক্বতা এবং আর্দ্রতা বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও উন্নত দেশে ময়েশ্চার মিটার দিয়ে আর্দ্রতা পরিমাপ করে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চোখের আন্দাজে বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে বিপুল পরিমাণ ধানের অপচয় ঘটে। এক্ষেত্রে কৃষকদের সচেতন করে তোলায় জোর তদারকি প্রয়োজন। দেশের কৃষককে আর্দ্রতা পরিমাপের জ্ঞান ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানানো গেলে চালের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। ধান কাটার সময় জাত, জমি ও আবহাওয়া যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি উন্নত যন্ত্রের ব্যবহারও বাড়াতে হবে। আরো একটি বড় বিষয় হলো, গবেষণায় যে পরিমাণ ফলন পাওয়া যায় উন্নত জাত থেকে, মাঠ পর্যায়ে সেটি মেলে না। বিশেষজ্ঞরা এজন্য ফসল বোনা থেকে উত্তোলন পর্যন্ত যে কয়েকটি ধাপ রয়েছে, সেটি সঠিকভাবে পালন না করাকে দায়ী করছেন। কৃষকের অর্থ সংকট ও জ্ঞানের স্বল্পতার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে কৃষকদের সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।

অনেক সময় অনুর্বর জমিতে এবং গাছের ছায়ায় বীজতলা করেন কৃষকরা, ফলে চারার গুণগত মান খারাপ হয় এবং পরবর্তী সময়ে ওই চারা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। কৃষকরা নানা কারণে (সময়মতো সেচের পানি না পাওয়ায়) বেশি বয়সের চারা মাঠে রোপণ করেন। ফলে বেশি বয়সের চারা থেকে বেশি কুশি হয় না এবং পরবর্তী সময়ে ফলন কমে যায়। আবার অনেক এলাকার কৃষকরা সুষম মাত্রায় সঠিক সার—ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক—ব্যবহার করেন না। কিন্তু গাছের বাড়বাড়তি এবং পর্যাপ্ত কুশি উৎপাদনের জন্য সুষম সার প্রয়োগ করা খুবই জরুরি। কৃষকদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় জমির উর্বরতা বিবেচনা করে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। সঠিক সময়ে সার দেয়ার ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করে তোলার জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। ক্রান্তিকালে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। আগাছা সঠিক সময়ে দমন না করলে বোরো মৌসুমে প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। বোরো মৌসুমে চারা লাগানোর পর দুবার-তিনবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় কৃষকরা সঠিক সময়ে আগাছা দমন না করায় আগাছা ধান গাছের সঙ্গে খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা করে ফলন কমিয়ে দেয়। সর্বোপরি স্থানভিত্তিক সঠিক জাতের বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং এগুলোর চাষাবাদ বাড়াতে হবে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচ কাজ বিঘ্ন হচ্ছে। হাওর এলাকার কিছু স্থানে এপ্রিল-মে মাসে ভূ-উপরিস্থ (ছোট নদী, খাঁড়ি, নালা ইত্যাদি) পানির অভাবে বোরো ফসলের শেষ পর্যায়ে সেচ প্রদান সম্ভব না হওয়ায় প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির জন্য এবং উপকূলীয় অলবণাক্ত এলাকায় সেচ অবকাঠামোর অভাবে বোরো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ৫ থেকে ২ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা বোরো আবাদে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পান না। তাই ফলন বাড়াতে এলাকা, মৌসুম, জমির ধরন অনুসারে লাগসই জাত নির্বাচন করা জরুরি। গুণগত মানসম্মত বীজ ব্যবহার করে সুস্থ-সবল চারা উৎপাদন করতে হবে। অধিক ফলন প্রাপ্তির জন্য জাত নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ফসল ব্যবস্থাপনা একান্তই অপরিহার্য। দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও ব্যবস্থাপনা, খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতা এবং নীতি ও কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে অনেক সীমাবদ্ধতা। খাদ্য নষ্টের কারণে খাদ্য ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তায় হুমকি যেমন হচ্ছে, তেমনি পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি কার্যক্রমে প্রযুক্তি কেনা ও তার ব্যবহার আরো জোরদার করতে হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে খাদ্যশস্যের এ অপচয় রোধে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা; এসব অপচয় রোধ করতে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে তার দক্ষতা বাড়াতে হবে। এছাড়া খাদ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ধাপগুলোর আধুনিকায়নও করা প্রয়োজন। এতে খাদ্যপণ্যের অপচয় কমে আসবে।  সনাতন পদ্ধতির কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের খাদ্য সংকট আরো প্রকট করে তুলেছে। আমাদের দেশে সর্বত্র আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে মান্ধাতা আমলে। সার ও কীটনাশক ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি লাগসই কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার। এক্ষেত্রে সরকারকে নিতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং জনগণকে নিতে হবে উদ্যোগী ভূমিকা। সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা ও কৃষিনীতি ঘোষণা করে কৃষি ক্ষেত্রে লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষককে সহযোগিতা দিতে পারে।