কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সরকারি প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের বিরোধিতা করে স্থান বরাদ্দের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটি এর আগে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণে জমি বরাদ্দ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। বন রক্ষায় তাদের এ অবস্থান জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করছে। বন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের তথা সরকারেরই। সেই রক্ষকরাই যদি বন দখল ও বিনষ্টের উদ্যোগ নেয়, তবে তার চেয়ে উদ্বেগজনক আর কিছু হতে পারে না। এমন পদক্ষেপ থেকে কর্তৃপক্ষকে বিরত রাখতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য সংরক্ষিত বন রক্ষায় তাদের এ উদ্যোগ জারি রাখা হবে বলে প্রত্যাশা। সংরক্ষিত বনভূমির জমি বরাদ্দ ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হোক।
কক্সবাজার জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা একসময় বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়া এ বনভূমি ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের জানমাল রক্ষায় অবদান রাখে। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মানবিক ও কৌশলগত কারণে এরই মধ্যে সরকারকে কক্সবাজার জেলার ছয় হাজার একরের অধিক বনভূমি বনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অনুমতি দিতে হয়েছে। এখন প্রশিক্ষণ একাডেমির ভবন নির্মাণের নামে ৭০০ একর বনভূমি বরাদ্দ দেয়া হলে তা নিশ্চিতভাবে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের নামে আরো বনভূমি ধ্বংসে উদ্বুদ্ধ হবে। তাছাড়া বন অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামত উপেক্ষা করে প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য অকৃষি ও খাসজমি দেখিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এ বনভূমি বরাদ্দ দেয়া ও নেয়া উভয় কর্মকাণ্ডই দেশের বিদ্যমান জাতীয় বন নীতি ১৯৯৪, বন আইন ১৯২৭, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১৬-সহ পরিবেশগত বিভিন্ন বিধিমালার পরিপন্থী এবং এ ধরনের কাজে বনভূমি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
সংরক্ষিত বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার নজির বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের খুব কম দেশেই মেলে। উৎপাদনশীল বনভূমিকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হলেও সংরক্ষিত বন রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন খুবই কঠোর। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা নির্মাণ দূরে থাক, মানুষের প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ও সংরক্ষিত বন রক্ষায় খুবই সোচ্চার। শিল্প-কারখানা নির্মাণ বা স্থাপনা নির্মাণের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেয়া সেখানে বাধ্যতামূলক। বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণে কোনো অনুমতিই দেয়া হয় না। কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকারি সিদ্ধান্ত পর্যন্ত মন্ত্রণালয় ফেরত পাঠানোর উদাহরণও দেশটিতে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অনুমতি ছাড়াই প্রশাসনের সামনেই সংরক্ষিত বনভূমিতে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ চলছেই। বিভিন্ন সময়ে বনভূমির জমিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চললেও তার ফল আশাপ্রদ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসরকারি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বনের জমি উদ্ধার করা যায়নি। এটি সরকারের বনভূমি রক্ষার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্মাণ করা হচ্ছে না, এমনকি এটি কৃষিজমিও নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ‘বন বিভাগের’ ‘সংরক্ষিত বনভূমি’ বরাদ্দ নেয়া হয়েছে ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের’ কাছ থেকে। বন বিভাগের জমি কীভাবে ভূমি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয়, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কেবল যে ভূমির মালিকানাই বেদখল হয়েছে তাই নয়, এক্ষেত্রে জালজালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনভূমিকে দেখানো হয়েছে ‘অকৃষি খাসজমি’ হিসেবে। এর মাধ্যমে আইন পাশ কাটানো হয়েছে। সন্দেহ নেই, ভবিষ্যতের জন্য এটি খারাপ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে আরো প্রশিক্ষণ একাডেমির প্রয়োজন থাকতেই পারে। সেজন্য সংরক্ষিত বনভূমিতে এটি নির্মাণের কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি থাকতে পারে না। সাভারের বিপিএটিসির বিশাল ক্যাম্পাসে বহুতল ভবন করা যায় বা তার পরিধি বাড়ানো যায়। বিকল্প কোনো স্থানে নতুন ক্যাম্পাসও প্রতিষ্ঠা করা যায়। তা না করে বনভূমি ধ্বংসের এ উদ্যোগ আত্মঘাতী।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বন ও বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও তা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতি দৃশ্যমান; বরং বনের জমিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বনের আশপাশের জমি সরকারি ও বেসরকারি শিল্প-কারখানা ও স্থাপনা তৈরিতে বরাদ্দ প্রদান, বনকেন্দ্রিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বনের জমি জবরদখলের মাধ্যমে বন ধ্বংসের বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। এতে বনজ সম্পদ ও বনভূমির অবক্ষয় বাড়ছে এবং বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে, যা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বনভূমি ব্যবহার ও ডি-রিজার্ভের আগে বন অধিদপ্তরের অনুমতি গ্রহণ, ত্রুটিমুক্ত ইআইএ সম্পন্নকরণ ও সমপরিমাণ ভূমিতে প্রতিবেশবান্ধব বনায়নে পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বনাঞ্চল আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে হলে একটি দেশে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়। আমাদের বনভূমি আছে তার অর্ধেকেরও কম। এ অবস্থায় একের পর এক বনভূমি বিভিন্ন দপ্তরকে বরাদ্দ দেয়া মোটেই কাম্য নয়। এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। সরকারি স্থাপনা নির্মাণের এ গতি বাড়লে দেশের অবশিষ্ট বনভূমি হারিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।










